চলচ্চিত্রের হালচাল-২০১৮

আলোচনা বেশি সফলতা কম

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:০৯

 ‘যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ’-প্রবাদটি যেন দেশীয় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির জন্য চিরন্তন সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে বছরের পর বছর। তারপরও সবারই মনে আশা থাকে সামনের দিনগুলো যাতে ফেলে আসা দিনগুলোর চেয়ে ভালো হয়। তেমনি সিনেমাপ্রেমীদেরও কামনা ছিল, ২০১৮ সালে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি গত দু-বছরের চেয়ে আরো ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু চলতি বছরে মৌলিক ছবি বাড়লেও সাফল্যের খাতা খুবই ছোট। এই সার্বিক বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিবেদনটি লিখেছেন নুরুল করিম

 

আমদানিকৃত ১২টি ও যৌথ প্রযোজনার ৩টিসহ সারাবছরে দেশের প্রেক্ষাগৃহে ৫৭টি চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেয়েছে। দেশীয় চলচ্চিত্রগুলোর বেশিরভাগই ছিল মৌলিক গল্পে নির্মিত, কিন্তু ব্যবসায়িকভাবে সফলতা পেয়েছে মাত্র ৫টি সিনেমা। এছাড়া চলতি বছরে কয়েকটি নতুন জুটিও পেয়েছে বাংলা চলচ্চিত্র। যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও সফল জুটি সিয়াম-পূজা। এই জুটির পোড়ামন ২ ও দহন বছরের ব্যবসাসফল ছবি। পুরোনো জুটির মধ্যে সবচেয়ে ভালো করেছে শাকিব খান-শবনম বুবলী জুটি। এই জুটি অভিনীত হিরো দ্য সুপারস্টার ও চিটাগাইয়া পোলা নোয়াখাইল্যা মাইয়্যা বছরের অন্যতম ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র।

বছরের শেষ সময়ে সবচেয়ে বড় চমকটি দেখিয়েছেন জয়া আহসান। হুমায়ূন আহমেদের দেবী উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত একই নামের সিনেমাটি বছরের সবচেয়ে বড় ধামাকা ছিল। জয়া, চঞ্চল চৌধুরী ও শবনম ফারিয়ার মন জুড়ানো অভিনয়ে বছর শেষে এখনো আলোচনায় এটি। অনম বিশ্বাসের এই ছবিটি নিয়ে আলোচনার আরেকটি দিক হলো, ছবিটির প্রচারণা দেশীয় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির জন্য শিক্ষণীয়। কীভাবে চলচ্চিত্রের প্রচারণা করতে হয় সেটি বেশ ভালোভাবেই দেখিয়েছে জয়া ও তার দল।

মাটির প্রজার দেশে, বেঙ্গলি বিউটি, কমলা রকেট, স্বপ্নজাল, স্বপ্নের ঘর ও কালের পুতুলকে বছরের সেরা সিনেমার তালিকায় রাখা যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ছবিগুলো কোনোটাই ব্যবসায়িকভাবে সফল না। এর নেপথ্যে অনেক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম ছিল, প্রচারণায় উদাসীনতা ও কম প্রেক্ষাগৃহ বুকিং পাওয়া। এই দুটি বিষয়ে যদি সফলভাবে কাজ করতে পারতেন তাহলে বছর শেষে সফল সিনেমার খাতাটা আরো বড় হতে পারতো।

মধ্যমানের ব্যবসা করেছে তিনটি সিনেমা। তার মধ্যে অন্যতম গিয়াস উদ্দীন সেলিম পরিচালিত স্বপ্নজাল,  মোস্তাফিজুর রহমান মানিকের জান্নাত ও ইফতেখার চৌধুরী পরিচালিত বিজলী।  আমদানিকৃত সিনেমাগুলোর মধ্যে শুধু ভাইজান এলো রে এবং সুলতান প্রেক্ষাগৃহে মধ্যমানের ব্যবসা করেছে। ভিন্নধর্মী আলোচনায় ছিল অন্তু আজাদের আহত ফুলের গল্প। চলচ্চিত্র কোনো প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি না পেলেও নির্মাতার উদ্যোগে বেশ কয়েকটি জায়গায় প্রদর্শন করা হয়। যার মাধ্যমে বেশ ভালো সাড়া পান তিনি। এছাড়া মাসুম আজিজের সনাতন গল্প, ফয়সাল রদ্দি ও আসিফ ইসলামের পাঠশালাও ভিন্নধর্মী আলোচনায় ছিল। নিম্নমানের সিনেমাও কম ছিল না এ বছর। প্রেমের কেন ফাঁসি, দেমাগ, ফিফটি ফিফটি লাভ, প্রেমিক ছেলে, পাঙ্কু জামাই, একটি সিনেমার গল্পসহ বেশ কয়েকটি সিনেমা দর্শকদের অপন্দের তালিকায় শীর্ষে ছিল। তাই স্বল্প সময়েই মুখ থুবড়ে পড়ে সিনেমাগুলো।

জয়া আহসান বলেন, ‘দেবীর সাফল্যে আমি অনেক আনন্দিত। দর্শকদের কাছেও আমি কৃতজ্ঞ। দেশে এখন অনেক ভালো ছবি নির্মিত হচ্ছে, এই সংখ্যাটাকে আরো বাড়াতে হবে। তাহলেই আমরা দর্শকদের হলমুখী করতে পারবো। দর্শকদেরও উচিত ভালো সিনেমাগুলো দলবেঁধে দেখা। তাহলে আমাদের চলচ্চিত্রকে আরো অনেকদূর এগিয়ে যাবে।’ শাকিব খান এ বছরের চলচ্চিত্র নিয়ে বলেন, ‘এ বছর আমাদের চলচ্চিত্রের অবস্থাটা আমার কাছে ইতিবাচক। বেশ ভালোকিছু কাজ হয়েছে। নতুন অনেকেই বেশ ভালো কাজ করেছে। আশা করবো আমাদের চলচ্চিত্রের বাজারটা আরো বড় হবে। এজন্য আমাদের সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।’

নির্মাতা অমিতাভ রেজা বলেন, ‘এ বছরের অবস্থা নিয়ে কিছু বলতে চাই না। তবে আমাদের আরো ভালো ভালো গল্পের দিকে নজর দেওয়া উচিত। সেইসাথে দর্শককে কীভাবে সিনেমাটা দেখাবেন সেই কারিশমাটাও ঠিক করা প্রয়োজন আগেভাগেই। নতুন বছরে সবার একটাই শপথ হওয়া উচিত, ভালো সিনেমা।’ বছরজুড়ে খানিক সফলতার মাঝে হারাতে হয়েছে অনেকখানি। যে ক্ষত পূরণ হওয়ার নয়।  ২০১৮ সালে এই ইন্ডাস্ট্রি হারিয়েছে লেখক, অভিনেতা ও চিত্রপরিচালক আমজাদ হোসেন, চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেন, প্রবীণ অভিনেত্রী রানী সরকার, চিত্রসম্পাদক সাইদুল আনাম টুটুল, অভিনেতা সিরাজ হায়দার, চিত্রনাট্যকার কাজী আজিজ আহমেদসহ অনেককে। এছাড়া আইয়ুব বাচ্চু জনপ্রিয় ব্যান্ড হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি গেয়েছে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের গান। তার কণ্ঠে আম্মাজান গানটি বাংলা চলচ্চিত্রের বহুল জনপ্রিয় গানের একটি। এই কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী ১৮ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন।

সবশেষে বলা যায়, এ বছর গতানুগতিক ধারার সিনেমার বাজার সঙ্কুচিত হয়েছে অনেকখানি, সম্প্রসারণ হয়েছে মৌলিক সিনেমার বাজার। এই সম্প্রসারণ বাড়লেই  বাড়বে দেশী চলচ্চিত্রের বাজার।