করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক উপেক্ষা করে ত্রাণসামগ্রী পাওয়ার আশায় ফুটপাতেই স্থায়ী ঠিকানা গড়ে নিয়েছেন চট্টগ্রামের দিনমজুর, রিকশাওয়ালাসহ হতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের বহু মানুষ। ফুটপাতেই রাত কাটাচ্ছেন তারা। গত কয়েক দিন ধরে নগরীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতে এমন চিত্র অহরহ দেখা যাচ্ছে। ফুটপাতে অবস্থানরত কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের অনেকেই বিভিন্ন বস্তিতে, মেসে বা ভাড়া ঘরে বসবাস করেন। কিন্তু চলমান করোনা দুর্যোগে বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংস্থা ত্রাণসামগ্রী দিলেও তারা তা ঘরে বসে পান না। এসব ত্রাণ অধিকাংশ সময় বস্তি পর্যন্ত পৌঁছায় না। তাই সরকারের ঘরে থাকার নির্দেশ পালন না করে তারা ফুটপাতেই রাত কাটাচ্ছেন। ত্রাণদাতারা রাস্তায় ট্রাক বা পিকআপ ভ্যান দাঁড় করিয়ে লোকজনের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী বিতরণ করে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করেন। তাই ত্রাণসামগ্রী যাতে হাতছাড়া না হয়, সেজন্য দরিদ্র বস্তিবাসীদের অনেকেই ফুটপাতে রাত কাটান। আবার অনেক পরিবারের সদস্যরা পালাক্রমে একজনের পর আরেকজন এসে রাস্তায় অবস্থান নেন।
এরকম গাদাগাদি ভিড়ের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ থেকে বিরত থাকতে প্রশাসন থেকে বারবার বলা হলেও তা কেউ মানছেন না। ত্রাণ বহনকারী গাড়ি দেখামাত্রই শত শত মানুষ গাড়ির কাছাকাছি যাওয়ার জন্য ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু করেন, যা থেকে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অবশ্য বড়ো রাস্তায় ত্রাণ দেওয়াকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তারা বলেন, বস্তিতে ঢুকে ত্রাণসামগ্রী দিতে গেলে প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। কিন্তু বড়ো রাস্তায় এরকম হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। তেমন পরিস্থিতিতে দ্রুত সরে যাওয়া যায়। সহজে মিডিয়ায় প্রচারণা পাওয়ার আশায় অনেকে বড়ো রাস্তায় ত্রাণ বিতরণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ফলে ফটোসেশন করার পরই আয়োজকেরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যান এমন দৃশ্যও দেখা গেছে। গত সোমবার জেলার হাটহাজারী উপজেলার মীর্জাপুর এলাকায় ফটোসেশন শেষ হওয়ার পর লোকজনের কাছ থেকে ত্রাণসামগ্রী কেড়ে নিয়ে তাদের মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। শুধু ফটোসেশন করার জন্য কিছু গোষ্ঠী ত্রাণ বিতরণ করছে বলে সম্প্রতি চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার অভিযোগ করেছেন।
এদিকে নিম্ন আয়ের লোকজনের পক্ষে নানাভাবে ত্রাণ লাভের সুযোগ থাকলেও অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার এসব সুযোগ-সুবিধার বাইরেই রয়ে যাচ্ছে। সংকোচ ও লোকলজ্জার ভয়ে তারা কারো কাছে হাত পেতে ত্রাণ নিতে পারছে না। ফলে এসব পরিবারেও শুরু হয়েছে টানাপোড়েন। অনেক পরিবার দৈনিক তিন বেলার পরিবর্তে দুই বেলা খাচ্ছে। দৈনন্দিন অনেক খরচ কাটছাঁট করেছেন অনেকে। সিটি করপোরেশন, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে গোপনে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানোর অঙ্গীকার করা হলেও এই আহ্বানে খুব একটা সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে ত্রাণসামগ্রী চাইতে বিব্রত বোধ করেন অনেকে। তবে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য রেশন চালু করার যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে চট্টগ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো উত্সাহিত বোধ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক ইত্তেফাককে বলেন, ‘রেশন দেওয়া শুরু হলে আমাদের মতো সীমিত আয়ের লোকজন খুবই উপকৃত হবে।’ প্রধানমন্ত্রী রেশন দেওয়ার জন্য তালিকা তৈরি করতে প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছেন। অতি দ্রুত এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে এই তালিকা তৈরির কাজ শেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের হাতে রেশন পৌঁছানো হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।’
