কোভিড-১৯, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বড় মহামারী হয়ে উঠবে বলে চিহ্নিত করছে বিশেষজ্ঞরা এবং সে দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব। আমরা যদি দেখি বর্তমানে কোভিড-১৯ এর সংক্রমিত হওয়ার পরিসংখ্যান, সেখানে বিশ্বের প্রধানতম উন্নত দেশেগুলোতে এর প্রকোপ এতো বেশি যে তারা এই সংকট মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে আছে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি সহ অন্যান্য উন্নত দেশসমূহ যারা কিনা সামনে থেকে এই পুরো বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে রাজনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, কূটনীতি এবং টেকসই উন্নয়নের মত প্রত্যেকটি জায়গা থেকে।
আমরা এখন চাঁদে যাওয়া থেকে শুরু করে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, পারমানবিক মারণাস্ত্র প্রস্তুতকরণসহ কতকিছুই তৈরি এবং জয় করছি যাকে বলা যায় বিজ্ঞানের এমন কোন উৎকর্ষতা নেই যা আমরা অর্জন করছি না। কিন্তু কোভিড-১৯ ভাইরাস আমাদের বিশ্বকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, আমাদের বিজ্ঞান চর্চা এবং বিজ্ঞানকে জয় করার পথটা এখনো বাকি। যদি তাই না হতো তাহলে আজকে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর মিছিল এত দীর্ঘ হতো না। আমরা এই সকল উন্নয়নের উৎকর্ষতায় পৌঁছানোর জন্য প্রকৃতির উপর এতো বেশি অবিচার করছি যার জন্য হয়তো সামনের সময়গুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ংকর প্রভাব আমরা দেখতে পাব যা কিনা কোভিড-১৯ কেও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছে বিশেষজ্ঞরা। এই কোভিড-১৯ মোকাবেলায় আমাদের এই পরাজয়ই বলে দেয় বৈশ্বিক চিকিৎসাশাস্ত্রে কি পরিমাণ বিনিয়োগ এবং মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন, পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য উন্নয়নকে রাষ্ট্রের ক্লাসে অমরা সবচেয়ে পিছনের সিটে রেখেছি।
ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়েস এর আইনের অধ্যাপক ড. ফ্রান্সিস বয়েল বলেন 'করোনা' ভাইরাস নয়, শক্তিশালী জৈব রাসায়নিক মারণাস্ত্র। এ এমন এক শক্তিশালী জৈব রাসায়নিক মারণাস্ত্র যার আঘাতে আমাদের রকেটের গতিতে চলতে থাকা বিশ্ব মূহুর্তের মধ্যে থমকে গেল। আমরা আজকে বিশ্বায়নের যুগে প্রত্যেকের দরজা বন্ধ করে দিয়েছি এই শক্তিশালী জৈব রাসায়নিক মারণাস্ত্রের ভয়ে যা কিনা পারমাণবিক অস্ত্র করতে পারেনি। এই বন্ধ হওয়া দরজা আজকে বিশ্বায়নকে চ্যালেঞ্জ করছে যা কিনা হুমকির মুখে নিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের অর্থনৈতিক চাকা। এই চাকার উপরে ভর করে উন্নয়নশীল দেশগুলো দেখছে উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন, যে চাকার উপর ভর করে চলে কোটি কোটি মানুষের জীবিকা। এই সকল উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে একটি দক্ষিণ এশিয়ায়, আয়তনে ছোট হলেও জনসংখ্যার দিক থেকে অত্যন্ত বড়, যার নাম বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ এখন উন্নত রাষ্ট্র হবার জন্য এগিয়ে যাচ্ছে যার অর্থনীতি এখন মধ্যম আয়ের দেশ। বাংলাদেশের জিডিপির হার আগের চেয়ে অনেক ভালো। একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে যেসব জায়গায় মনোনিবেশ করা প্রয়োজন সেসব জায়গায় কাজ করে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এমনই সময় যেন থমকে গেল সকল পরিকল্পনা যেখানে এখন পুরো বিশ্ব আজ থমকে গেছে কোভিড-১৯ এর ভয়াল থাবায়। কোভিড-১৯ যখন প্রবল আকারে ঘায়েল করে ফেলেছে উন্নত বিশ্বকে তখন আমরা হয়তো কিছুটা সময় আমরা পেয়েছিলাম গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু সময়টাকে আমরা কাজে লাগাতে পারিনি, যার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দাঁড়িয়ে আছি আজকের বাস্তবতায়। আমরা হয়তো চেষ্টা করছি আমাদের সীমিত সম্পদের মধ্যে সর্বোচ্চ দিয়ে।
আমরা হয়তো উন্নত দেশ যেমন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালির মতো অর্থনৈতিক হিসেবে বড় নেই, কিন্তু আমাদের এই ১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে আয়তনে এবং জনসংখ্যায় অনেক উন্নত দেশের তুলনায় অনেক বড়। জনসংখ্যায় বড় এই রাষ্ট্র থমকে গেছে কোভিড-১৯ এর প্রভাবে। থমকে যাওয়া আমাদের দেশের খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্র হয়তো উন্নত রাষ্ট্রের মতো পরিকল্পনা করতে পারেনি তারপরও রাষ্ট্রের জায়গা থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং দায়িত্বে সামিল হয়েছে। দায়িত্ব নিয়েছে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী, দায়িত্ব নিয়েছে রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী, দায়িত্ব নিয়েছে রাষ্ট্রের প্রশাসন যাতে কোভিড-১৯ মোকাবেলা করে সংকট উত্তরণ করা যায়। নানা প্রকারের উদ্ভাবনী প্রক্রিয়ায় জনগণকে সচেতন করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দায়িত্ব কি শুধু রাষ্ট্রের? আমাদের কি কোনো দায়িত্ব নেই? দায়িত্বটা আসলে আমাদের সবার। কারণ সংকট যেমন সবার তেমনি দায়িত্বটা সবাইকেই ভাগ করে নিতে হবে। আজকে যখন সরকার সাধারণ ছুটি ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত করেছিল তখনও দেখি অনেক পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য কারখানার মালিকগণ তাদের শ্রমিকদের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেনি, যখন সরকার বাধ্য করলো তখন ছুটি ঘোষণা করলেন। পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য মালিকগণ কি তাদের দায়িত্বটা পালন করেছেন?
আবার সবাইকে যখন দেয়া হয়েছে সাধারণ ছুটি ঐসময় সকলে মিলে বাসে, ট্রাকে, ট্রেনে, লঞ্চ, ফেরিতে করে সামাজিক দূরত্ব না মেনে ছুটলেন গ্রামে নিজে পরিবারের কাছে, তারা হয়তো জানেন না তারা করোনাভাইরাসে সংক্রমিত কিনা অথবা যদি ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হন তাহলে তিনি এবং তার পরিবার এই ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হবেন পাশাপাশি তার প্রতিবেশী, এমনকি পুরো গ্রাম এবং সমাজ এর দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে। তাঁরা কি তাদের দায়িত্বটা পালন করেছেন? বিশ্ব যখন কোভিড-১৯ এর প্রভাবে সংক্রমিত এবং মৃত্যুর মিছিলে আমাদের তখনো হুঁশ ফেরেনি ঐসময় ৪ তারিখ যখন সাধারণ ছুটি শেষ তখন সরকার ছুটি বাড়িয়ে ১১ এপ্রিল করা হলো তখনো পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য কারখানার মালিকগণ ছুটি বৃদ্ধি করেননি কিন্তু শ্রমিকেরা জীবিকার তাগিদে চাকরি বাঁচাতে পায়ে হেটে কর্মস্থলে যোগদানের জন্য এসেছেন গণপরিবহন না থাকা স্বত্বেও। এবারও কি পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য মালিকগণ কি তাদের দায়িত্বটা পালন করেছেন? মানবিক জায়গা থেকেও কি তাঁরা তাদের শ্রমিকদের দায়িত্ব নিতে পারেন না?
আমাদের দেশ এখন তারুণ্য নির্ভর দেশ যেখানে ৫ কোটি ৩০ লক্ষ তরুণ যা মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ। আমরা বলি তরুণরাই আমদের দেশের ভবিষ্যৎ। আমরা সামনের সময়ে জনসংখ্যার ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ড সুবিধা ভোগ করবো। কিন্তু দেখা যায় এই তরুণরাই রাষ্ট্রের আইন অমান্য করছে। পুলিশ এবং প্রশাসনের নিয়ম এবং আদেশ ভঙ্গ করে এই সংকটাপন্ন সময়ে সামাজিক দূরত্ব না মেনে চলাফেরা করছে। সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে বাসায় থাকার জন্য কিন্তু যারা বাসায় না থেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে চলাফেরা করছে তারা কি তাদের দায়িত্বটা পালন করছে? তারা কি বাংলাদেশের এই গুরু দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে সক্ষম? তরুণদের উচিত সংকটকালে সমাজের জন্য কাজ করা, দায়িত্বটা বুঝে নেয়া। নিজেকে প্রস্তুত করা আগামীর জন্য, নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য, দেশের জন্য। এই সময়ে ঘরে বসে নিজের প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলোকে বৃদ্ধি করা, প্রযুক্তির কল্যাণে বিভিন্ন অনলাইনে কোর্স গুলোকে সম্পন্ন করা। যারা উদ্ভাবনী বিষয় নিয়ে কাজ করতে চান তাঁরা আইডিয়াগুলো নিয়ে চিন্তা করা যাতে করে সংকট পরবর্তী সময়ে কাজে নেমে পড়তে পারে। নিজেকে দক্ষ করে তোলা এবং নিজেকে প্রস্তুত করা তোলা আগামী জন্য।
বাংলাদেশে বিত্তশালী নাগরিকের সংখ্যা অনেক। এই কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে এই সকল বিত্তশালী নাগরিকগণ তাদের আশে পাশের খেটে খাওয়া দিন মজুর এবং নিম্ন আয়ের নাগরিকের সহায়তায়, তাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসতে পারে না? তারা অসহায় মানুষের পাশে দাড়াতে পারে না? তারা কি অসহায় মানুষের দায়িত্বটা নিতে পারেন না?
এসবের পরেও আশা জাগে, যখন দেখি একদল অকুতোভয় তরুণ এই সংকটাপন্ন সময়ে অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। রাত জেগে মানুষের জন্য কাজ করা, রাতে মানুষের জন্য খাবার পৌঁছে দেয়া, সবাইকে কোভিড-১৯ মহামারি বিষয়ে সচেতন করা, ডাক্তার, নার্স এবং স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের জন্য বিনা খরচে পরিবহন সুবিধার ব্যবস্থা করা, পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সহায়তায় তাদের পাশে থাকা, পুলিশকে যখন দেখি নিরাপত্তার পাশাপাশি রাতে অসহায় মানুষের বাসার খাবার পৌঁছে দেয়া, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যখন নিজ দায়িত্বে মানুষের পাশে দাড়ায়, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডাক্তার, নার্স এবং স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের যখন দেখি রোগীকে সেবা করা, জনপ্রতিনিধিদের রাত জেগে মানুষের জন্য কাজ করা করা তখন আশা জাগে। দায়িত্বটা যখন তারা নিজ কাঁধে তুলে নেন তখন মনে হয় আমরা এই কোভিড-১৯ মহামারিকে জয় করতে পারবো। দায়িত্ব যখন সবার তখন সবাই মিলে সংকট মোকাবেলা করতে হবে একসাথে। রাতের অন্ধকারকে জয় করে উদিত হবে নতুন সূর্যের, সেই সূর্যের আলোয় আলোকিত হবে আমাদের স্বপ্ন, এই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।
লেখক: মোহাম্মদ মামুন মিয়া
মেম্বার, ট্রাস্ট্রি বোর্ড এবং সাবেক সভাপতি, জাতিসংঘ যুব ও ছাত্র সমিতি বাংলাদেশ
