করোনার তথ্য কি গোপন রাখা সম্ভব?

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২০, ২১:৪৬

এক সময় বেতার নাটক খুব জনপ্রিয় ছিল। বরিশালের গৈলা বাজারে ষাটেরর দশকের শুরুতে একটি বেতার যন্ত্র। যার আকার বেশ বড়। রেডিও পাকিস্তান, ঢাকা কিংবা ভারতের আকাশবাণীতে যখন নাটক পরিবেশিত হতো ভিড় জমত অনেকটা সিনেমা হলের মতো।

সে সময়ে একটি নাটক শুনেছিলাম, যার বিষয়বস্তু ছিল অনেকটা এ রকম নানা সামজিক অনুষ্ঠানে বা আত্মীয়দের বাড়িতে গিয়ে এক মহিলার ধারণা হয়েছে, হৃদরোগ বা হার্টের অসুখ হয় কেবল বড় লোকদের। তার স্বামীর উপার্জন যথেষ্ট ভাল, কিন্তু বড় লোকদের ব্যামো তো তার নেই। তাহলে কী তিনি যথেষ্ট বড় লোক নন? কেন হৃদরোগ নেই, সেটা নিয়ে স্বামীকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছিলেন তিনি। কিন্তু অনেক ডাক্তার দেখিয়েও এমন লক্ষণ  মেলেনি। কিন্তু স্ত্রী হাল ছাড়েন না। এক পর্যায়ে তিনি খুঁজে বের করেন অনেক বড় এক ডাক্তারকে। তিনি হার্টের সম্ভাব্য রোগীকে দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণ করে অনেক ধরনের টেস্ট দিলেন। এ সব টেস্ট করাতে টাকার বড় অঙ্ক দেখে ভয়ে সত্যিই তিনি ডাক্তারের চেম্বারে বসেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন।

নাটকটি নারী বিদ্বেষী, সন্দেহ নেই। তবে বাংলাদেশে কেন করোনা রোগী এত কম,  সেজন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত কিছু লোকের কাণ্ডকারখানা দেখে অনেক আগে শোনা এ নাটকটির কথা মনে পড়ে গেল। করোনার সূত্রপাত চীনের একটি এলাকায়। তারপর দক্ষিণ কোরিয়া ও ইরান হয়ে ছড়িয়ে পড়ল ইউরোপের নানা দেশে। সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়। আফ্রিকায় এর প্রকোপ একেবারেই সীমিত। দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়াতেও তাই। কেন দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশে করোনা এখন পর্যন্ত তেমন দাঁত বসাতে পারছে না, তা নিয়ে বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা চলছে। বিবিসির প্রতিবেদনেও দক্ষিণ এশিয়ার বিষয়টি এসেছে। লন্ডনে কাজ করেন, বিবিসি বাংলা বিভাগের এক সাংবাদিক বলেন, এটা এক ধরনের ধাঁধা বৈকি। কিন্তু আমাদের ‘৮৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক’ বিবৃতি দিয়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের প্রকৃত হিসাব প্রকাশের দাবি করেছেন। তারা বলেছেন, আইইডিসিআর দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মিল নেই। তারা বলেন, সরকারি তথ্যে মানুষের মনে প্রশ্ন ও সন্দেহ জাগাতে শুরু করেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের সঙ্গে ব্রিফিংয়ে প্রদত্ত তথ্যের পার্থক্য চোখে পড়ার মতো উদ্বেগজনক।

চীনে যখন এ ভয়ঙ্কর ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে, পাশ্চাত্য দুনিয়া তা নিয়ে উপহাস করেছে। ইরানকে তো যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বহু বছর ধরে এক ঘরে করে রেখেছে। কিন্তু মহাবিপদ যখন দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় দু’শ কোটি লোককে অনেকটা বাইপাস করে ইতালি, স্পেন, ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সসহ ইউরোপের অনেক দেশকে কাবু করে যুক্তরাষ্ট্রে হানা দিল ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ওই সকল দেশের রাষ্ট্রনায়করা এখন প্রত্যেকেই কমবেশি কাঠগড়ায়। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ। একেকটা দেশে দিনে মৃত্যু ঘটছে শত শত। নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রশ্ন দেখলাম ক্যান্সারের এক রোগী করোনায় আক্রান্ত, তাকে কি ভেন্টিলেশনের সুবিধা দেওয়া উচিত? যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, দুই লাখ লোক তাঁর দেশে মারা যেতে পারে। মৃতের সংখ্যা এক লাখে সীমিত রাখতে পারলে তিনি মনে করবেন ‘করোনা প্রতিরোধে বড় সাফল্য’ অর্জিত হয়েছে।

কেবল বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় করোনা তেমন করে দাঁত বসাতে কেন পারেনি? এ পাজল-এর উত্তর দ্রুত পাওয়া গেলে ভাল। কেউ বলছেন এ অঞ্চলের উষ্ণ আবহাওয়ার কথা। কেউ বা বলছেন, জীবনযাপনের বৈশিষ্ট্যের কথা। কেউ বা বলছেন, গ্রীষ্ম-বর্ষা শেষে শীত আসলে করোনা হাজির হবে। এমনটি না হোক, কায়মনোবাক্যে চাইব।

বিবিসি ২ এপ্রিল ভাইরোলোজিস্ট অধ্যাপক নজরুল ইসলামের সাক্ষৎকার প্রচার করেছে। তিনি নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশে এ ভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ইতালি ফেরত ব্যক্তির মাধ্যমে হয়েছে। ইতালিলতে যে ভাইরাস হ্যাভক তৈরি করেছে, সেটা কি বাংলাদেশে ভিন্ন আচরণ করছে? তাঁর মতে, চীনের উহান থেকে যে ভাইরাসের উৎপত্তি তাতে মিউটেশন হয়েছে। কিছু দেশে একই ধরনের প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়। আবার কোথাও একট ভিন্ন। বাংলাদেশে ভাইরাসটি উহান থেকে আসেনি।

বিবৃতিদাতা বিশিষ্ট নাগরিকরা তথ্য গোপনের অভিযোগ করেছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সঙ্গেও সরকারি ভাষ্যে পার্থক্য রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। ভাল হতো যদি তারা তথ্য-প্রমাণ হাজির করতেন। তারা বলতেন পারতেন, দেশের এই এই স্থানে এই এই ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হয়ে ভাল হয়েছে কিংবা মৃত্যুবরণ করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে তারা একটি ঘটনারও উল্লেখ করেননি, যা থেকে আমাদের মনে হতে পারে যে ‘গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের সঙ্গে ব্রিফিংয়ে প্রদত্ত তথ্যের পার্থক্য চোখে পড়ার মতো উদ্বেগজনক’। 

গণমাধ্যমে বরং আমরা ভিন্ন চিত্র দেখি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কারও দেহে রোগের লক্ষণ দেখা দিলে কোনোভাবেই যেন লুকানোর চেষ্টা না হয়। গত কয়েকদিনের বিভিন্ন সংবাদপত্রে বলা হচ্ছে, করোনা আক্রান্ত বলে সন্দেহ বেশ কয়েকজনের পরীক্ষার পর জানা গেছে করোনায় আক্রান্ত হননি তারা। লক্ষীপুর, গাংনি, বাঞ্ছারামপুর, রাজশাহী, শরীয়তপুর, বরিশাল, মাগুরা, গাজীপুরের খবর আমরা দেখেছি সন্দেহ সত্য হয়নি। কারও শ্বাসকষ্ট, কাঁশি, জ্বর, এমনকি নিউমোনিয়া হলেই করোনা, এটা সাধারণ ব্যক্তিদের ধারণা হতেই পারে। কিন্তু বিশিষ্ট নাগরিকরা কেন সেটা মনে করবেন? 

কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে লুকিয়ে রাখা কি সম্ভব? কোনো বাড়িতে যদি একজন আক্রান্ত হন, তার পরিবারের অন্যদের আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা প্রবল। ইন্ডিপেনডেন্ট টিভির এক ক্যামেরামান আক্রান্ত হওয়ার কারণে ৪৭ জন কর্মীকে কোয়ারেনটাইনে পাঠাতে হয়েছে। ভারতের দিল্লিতে তবলিগ জামাতে যারাই অংশগ্রহণ করেছে, তাদের অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এক শিখ ধর্মগুরু করোনায় মারা যাওয়ার ঘটনায় তার সংস্পর্শে কারা এসেছিল, সেটা খুঁজে বের করা হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজধানী মিরপুরে দু’জন রোগীর সন্ধান পাওয়ায় একটি বড় এলাকাকে কয়েকদিন প্রায় ‘বিচ্ছিন্ন’ করে ফেলা হয়। অনেক গ্রামকেও এভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হচ্ছে। সরকার যদি কোনো তথ্য গোপন করতে চায়, সোশাল মিডিয়ায় সেটা কি আসবে না? বাঞ্ছারামপুরের একটি বাড়িতে একজন রোগী আছে সন্দেহে প্রশাসন সে বাড়িতে লাল নিশান টানিয়ে দিয়েছিল। শ্বাসকষ্ট-নিউমোনিয়ায় মারা যাওয়ায় করোনা সন্দেহে একাধিক লোকের সৎকারে জটিলতার খবর আমরা জেনেছি। বিশিষ্ট নাগরিকরা কি এ সব খবর দেখেন না?

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ইউরোপ-আমেরিকার মতো নয়। সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ডের চেয়ে আমরা ঢের পিছিয়ে। ভারতের দিল্লি, বাঙ্গালোর, মাদ্রাজে এমনকি কলিকাতাও বাংলাদেশের অনেক রোগীর পছন্দ। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে যে আমাদের গড় আয়ু ৭০ বছরের বেশি এবং এ তথ্য জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বীকৃত। এ অর্জন এমনি হয়নি। এ জন্য শেখ হাসিনার সরকারের সচেতন প্রয়াস অস্বীকার করা যায় না।

বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজারের মতো লোক মারা যায়। করোনার হানার পর এ সংখ্যায় তেমন পরিবর্তন কী ঘটেছে? করোনা পরীক্ষা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটলে সেটা জানা কঠিন কাজ নয়। ‘বিশিষ্ট নাগরিকরা’ এ তথ্য প্রকাশ করবেন, সে প্রত্যাশা রইল। একইসঙ্গে একান্ত প্রার্থনা, বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ ইউরোপ-আমেরিকার মতো যেন না হয়। প্রায় দু’শ কোটি লোকের বসবাসের এলাকা দক্ষিণ এশিয়াতেও এটা কাম্য নয়। সেটা ঘটলে জীবিতরা মৃতদের ঈর্ষা করবে। তখন কেবল আক্রান্তদের নয়, মৃতদের হিসাব রাখাও অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ইত্তেফাক/এসি