সামপ্রতিক

ইন্টানেটের গতি মন্থর নয়, চাই সাইবার ইন্টেলিজেন্সের সতর্কতা

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:০২

আজ রাত পোহালেই ভোট। গেল সপ্তাহে পোস্টারে ছেয়ে যাওয়া রাস্তাঘাট-অলি-গলিতে একটি নির্বাচনী আমেজ তৈরি হয়েছিল। এজন্য প্রতিপক্ষের লোকজনের পোস্টার ব্যানার ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগও বিস্তর পাওয়া যাচ্ছিল। শোনা যাচ্ছিল শেষ ডিসেম্বরের হিমেল বাতাস ও কনকনে ঠান্ডার সঙ্গে চতুর্দিকে ভারী-ভাঙা গলায় মাইকের আওয়াজ। পাশাপাশি গত ক’দিনের গুঁড়িগুঁড়ি দিন-রাতভর বেরসিক বৃষ্টিতে প্রচারণায় ছন্দপতন ঘটে। ‘পোস্টার নেই, শুধু টাঙ্গানো রশিগুলো উপহাস করছে’—বলে সংবাদের শিরোনামও দৃষ্টিগোচর হয়েছে এ সময়। এখন প্রচারণা শেষ। চলছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য চিন্তা-ভাবনা।

এখন কেউ কেউ ভোটারদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভোটার নম্বরের স্লিপ দিচ্ছেন। চাচ্ছেন ভোট ভিক্ষাও, কেউ কেউ অতীতের ভুলের জন্য গণমাধ্যমে ভোটারদের নিকট সরাসরি ক্ষমা চাচ্ছেন! মাঠ পাহারায় রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। মোদ্দাকথা, আজকাল মানুষ চায় ভোটের কাজ দায়িত্বশীলগণ নিরপেক্ষতার সঙ্গে পালন করে একটি নতুন ইতিহাস গড়ুন। এজন্য বিদ্যুত্ বা ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া বা নেটের গতি মন্থর করে দেওয়া ঠিক নয়। এটা খুবই অর্বাচীন কাজ বলে মনে করছেন অনেকেইে। একাজগুলো মানুষের বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার শামিল। নির্বাচনে বিশ্বমিডিয়া বা বিশ্ববাসীর চোখ বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ বলেও মনে করতে পারেন অনেকে। আমার মতে, এমুহূর্তে কোনো নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়ার অর্থ হলো- মানুষকে অহেতুক ক্ষেপিয়ে তোলা ও ডিজিটাল বাংলাদেশের শ্বাসরোধ করে দেওয়া! কারণ বর্তমানে দেশের হাজার হাজার বেকার যুবক দেশ-বিদেশ থেকে অনলাইনে ডাটা এন্ট্রিসহ বিভিন্ন অর্ডার নিয়ে পার্টটাইম কাজ করছেন। শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন ক্লাসে যোগ দিচ্ছে এবং লাইব্রেরি ঘেঁটে পড়াশুনা করছে। সাইবার শপগুলোতে মানুষ ই-মেইল পাঠানো, চাকরির আবেদন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন, ফলাফল দেখা, বিভিন্ন ধরনের সেবা বিকি-কিনি করছেন। ব্যাংকের এটিএম বুথের মাধ্যমে লেন-দেন করা ও অনলাইন শপিং এখন একটি নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। সেক্ষেত্রে এক মিনিট বিদ্যুত্ না থাকা বা ইন্টারনেট সেবা মন্থর হওয়া বা বিঘ্নিত হওয়া মানে কোটি কোটি টাকা ক্ষতির ব্যাপার।

মোদ্দাকথা, দেশের আয় বাড়ানোর অন্যতম হাতিয়ার এখন ইন্টারভিত্তিক সেবার সচলতা। তাই হঠাত্ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে আমাদেরকে এদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। সংবাদ মাধ্যমে জানা গেল- ভোটের দিন ইন্টারনেটের গতি মন্থর করে দেওয়া হবে। ফলাফল প্রকাশের সময় গতি বাড়ানো হবে। এটা জনমনে সন্দেহের উদ্রেক করতে পারে। মানুষ ঘরে বসে তথ্য পেতে চায়। হাতের তালুতে প্রয়োজনীয় তথ্য পেলে বাইরে বের হয়ে হইচই করবে কেন? বরং তথ্য পেতে দেরী বা ব্যর্থ হলেই নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ বেড়ে যাবে।

ভোটের দিন সকালে ইন্টারনেটের গতি কমানো ও ফলাফল প্রকাশের সময় গতি বাড়ানো নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত করতে পারে। সকালে-বিকেলে গতি কমানো বাড়ানো এসব স্ববিরোধী কথা নির্বাচন কমিশনকে বলে মানুষের মনে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করার দরকারই বা কী? আমার কথা হলো, কোনো ধরনের সাইবার অপরাধ আঁচ করে থাকলে বা কেউ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গুজব রটানোর চেষ্টা করলে সাইবার ইন্টেলিজেন্সকে সতর্ক রাখুন- নেট বন্ধ করতে হবে কেন? তারা চাইলে সঙ্গে সঙ্গে সেই অপরাধীর অপতত্পরতা বন্ধ করে দিতে পারেন। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নিতে পারেন।

ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল স্তরের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সেবাদানকারী জনবলকে জনগণের সার্বিক সুবিধার কথা মাথায় রেখেই বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের জনগণের জন্য জনসেবায় স্বাধীনভাবে কাজ করতে নির্ভয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এভাবে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন যেমন অনুষ্ঠিত হবে, তেমনি দেশের আর্থ-সামাজিক অঙ্গনে টেকসই উন্নয়নের একটি মজবুত ভিত্তি গড়ে উঠার প্রক্রিয়াও অব্যাহত থাকবে।

n লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

E-mail: [email protected]