সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসের সংক্রমণে সকল দেশের মতো বাংলাদেশও ঝুঁকির বাইরে নয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে এই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের প্রভাব পড়েছে নানাভাবে। এই রোগ সংক্রমণ যেমন :রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত জীবনে পরিবর্তন নিয়ে এসেছে, তেমনিভাবে পরিবর্তন এনেছে আমাদের মনোজগতেও। করোনা ভাইরাসের কথা উঠলেই যে বিষয়গুলো মাথায় ঘুরপাক খায় তা হলো—ভয়, আতঙ্ক, উদ্বিগ্নতা, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি। যার ফলে আমাদের মধ্যে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে মানসিক চাপ। এই মহামারির সময়ে পারিপার্শ্বিক অবস্থার জন্য ভয় আতঙ্ক, উদ্বিগ্নতা ও রাগ এই আচরণগুলো খুবই স্বাভাবিক বিষয়, কিন্তু একটা বিষয় মনে রাখতে হবে অতিরিক্ত মানসিক চাপ আমাদের শরীরে ব্যক্তিগত রোগপ্রতিরোধ-ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করে। যার ফলে এই করোনা ভাইরাস সংক্রমণে প্রতিরোধের পর্যায়গুলো দুর্বল হয়ে যায়। আর এজন্যই আমাদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে প্রয়োজন দৃঢ় মনোবল, সাহস ও ধৈর্য। ইন্টার এজেন্সি স্ট্যান্ডিং কমিটির মতে—বৈশ্বিক যে কোনো মহামারির সময় যে কেউ যে কোনো সময় আতঙ্কিত বা মানসিকভাবে দুর্বল বোধ করতে পারেন। এমন সময়—
* অসুস্থতার ভয় বা মৃত্যুভয়ে আক্রান্ত হতে পারেন। * রোগ সংক্রমণের ভয়ে চিকিত্সা নেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন। * বেতনাদি থেকে বঞ্চিত হওয়া, কাজ করতে না পারা এবং চাকরিচ্যুত হওয়ার ভয়ে ভুগতে পারেন। * রোগের সংস্পর্শে আসার বা আসতে কোয়ারেন্টাইনে থাকা অবস্থায় সামাজিকভাবে বিচ্যুত হবার ভয় করতে পারেন। * ভাইরাসের কারণে প্রিয়জনদের রক্ষা করতে না পারার বা প্রিয়জনকে হারানোর ভয় করতে পারেন। * কোয়ারেন্টাইনে থাকা অবস্থায় কাছের এবং খেয়াল রাখা মানুষগুলোর থেকে আলাদা হয়ে যাবার ভয় পেতে পারেন। * অভিভাবক বা কেয়ারগিভাররা সবার থেকে আলাদা থেকে ইনফেকশনের ভয়ে সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষ, প্রতিবন্ধী ও বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের সেবা দিতে অপারগতা প্রকাশ করতে পারেন। * সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে অসহায়ত্ব বোধ, একঘেয়ে লাগা, একাকিত্ব বোধ এবং ডিপ্রেশন হতে পারে। * পার করে আসা মহামারির সময়টা আবার ফিরে আসার ভয় হতে পারে।
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষার একমাত্র উপায় হচ্ছে সচেতনতা। যেহেতু এই রোগের কোনো প্রতিষেধক এখনো তৈরি হয়নি, তাই ব্যক্তিগত কিংবা সামাজিক সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। আতঙ্কিত না হয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের এই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে পারি। এখন আসি এই করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ভয় বা আতঙ্ককে আমরা কীভাবে মোকাবিলা করতে পারি। যেহেতু মানসিক চাপ আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করে আর নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যদি দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে এই ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই মানসিক চাপ সামলানোর জন্য আমরা যে কাজগুলো করতে পারি :
১. ইতিবাচক ভাবনা :মানসিক চাপ মোকাবিলায় ইতিবাচক চিন্তা কিংবা পজিটিভ থিংকিংয়ের গুরুত্ব অনেক। করোনা ভাইরাস সম্পর্কে শুধু নেতিবাচক চিন্তা না করে ইতিবাচক তথ্যগুলোর দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে।
—করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়া মানেই মৃত্যু নয়।
—সারা বিশ্বের পরিসংখ্যানের দিকে যদি লক্ষ করি তাহলে দেখা যায়, করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত অধিকাংশ ব্যক্তি স্বাভাবিক চিকিত্সায় পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়।
২. সঠিক তথ্য আরোহণ ৩. সুশৃঙ্খল জীবনযাপন ৪. যোগাযোগের মাধ্যম ৫. পরিবারকে সময় দিন ৬. নিজেকে সময় দিন ৭. রাগে করণীয় :সবাই যেহেতু মানসিক চাপে আছে, তাই অল্পতেই বিরক্ত হওয়া, মেজাজ খিটখিটে হওয়া বা রেগে যাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু রাগ যদি খুব বেশি মাত্রায় হয় তাহলে সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাহলে কি কোভিড-১৯ কিংবা করোনা ভাইরাস নিয়ে আমরা কোনো ভয় পাব না? এই প্রশ্নটাও আসা স্বাভাবিক। আবারও বলে নিচ্ছি, ভয় পাওয়া আতঙ্কিত হওয়া এইগুলো এই মহামারির সময়ে একটা স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়া। শুধু খেয়াল রাখা প্রয়োজন যে এই ভয় কিংবা আতঙ্কের মাত্রা বেড়ে গিয়ে যেন আপনার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত না করে, একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কগুলো নষ্ট না করে দেয়। তাহলে অসহায়ত্ব কিংবা একাকিত্ব বোধ আপনাকে গ্রাস করবে এবং মানসিকভাবে আপনাকে দুর্বল করে দিবে। তাই অতিরিক্ত ভয় বা আতঙ্কগ্রস্ত না হয়ে সামাজিক ও ব্যক্তিগতভাবে সচেতন থাকতে হবে। এই সময়টাকে আমরা বাসায় থেকে বিভিন্নভাবে কাজে লাগাই এবং নিজের পাশাপাশি দেশ ও সমাজকে সুরক্ষিত রাখি তবেই আমরা এই সংকটময় সময়টা ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠতে পারব।
n লেখক : চিকিত্সা মনোবিজ্ঞানী ও প্রভাষক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
