অনেক দিন আগের কথা। এক দেশে ছিল এক জমিদার। সে ছিল খুবই রাগী আর অত্যাচারী। সে কথায় কথায় প্রজাদের ঠেঙায়। কেউ খাজনা দিতে না পারলে তাকে ভিটেবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে। নয়তো ফাটকে ভরে। সবাই তাকে যমের মতো ভয় পায়। কেউ তাকে পছন্দ করে না। ভালোবাসে না।
একদিন জমিদার ভাবে, তার মাথার দু’পাশে যদি ষাঁড়ের মতো বড়ো শিং গজাত, তাহলে মানুষ তাকে আরো বেশি ভয় পেত। বড্ডো মজা হতো তখন। যে-ই না সে এমনটা ভেবেছে অমনি তার কপালের দু’পাশে কেমন যেন সুড়সুড় করতে থাকে। সে কপালের দু’পাশে হাত বোলায়। দেখে, দু’পাশে অবিকল শিং গজিয়ে উঠেছে। দেখতে দেখতে ইয়া বড়ো সুচালো শিং!
পরদিন সকালে নাপিত এসেছে জমিদারের চুল কাটতে। চুল কাটতে কাটতে নাপিত দেখে জমিদারের মাথায় প্রায় দু ইঞ্চি লম্বা শিং। নাপিত তা দেখে অবাক হয়। তবে ভয়ে কিছু বলে না। চুল কেটে চলে যায়। সে-ই রটিয়ে দেয়, জমিদারের মাথায় শিং গজিয়েছে।
জমিদারের নায়েব-গোমস্তা, পাইক-পেয়াদা আর লাঠিয়ালবাহিনীর সবাই ভাবে—মানুষের মাথায় কখনো শিং গজায় না, পশুরই শিং হয়। তারা জমিদারবাড়িতে গিয়ে দেখে, জমিদারের মাথায় সত্যি বিশাল দুটো শিং; তার দুই মাথা কী সূচালো আর ধারালো! কিন্তু সেই সূচালো আর ধারালো শিং কোনো কাজেই আসছে না জমিদারের; বরং শিংয়ের ভারে সে ভালোভাবে মাথাই তুলতে পারছে না।
হঠাত্ কথা বলে নায়েব—মানুষের যখন শিং গজায় তখন সে আর মানুষ থাকে না, সে হয়ে যায় পশু। আপনিও তাই হয়ে গেছেন। আর কোনো পশুকে তো আমরা জমিদার বলে মেনে নিতে পারি না। নায়েবের কথা শুনে তখন সবাই একযোগে ঘর ফাটিয়ে চিত্কার করে বলে—পারি না, পারি না!
জমিদার কোনো কথা বলে না। শুধু তার দু’চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে দরদর করে। তখন লাঠিয়ালবাহিনীর সর্দার বলে, ‘জমিদার সাহেব, আপনার হুকুমে আমরা অনেক ভালো মানুষের মাথায় লাঠি মেরেছি। অনেক অত্যাচার করেছি প্রজাদের। আপনি কখনো প্রজাদের ভালবাসেননি, তাই খোদাও আপনাকে ভালবাসেন না। তিনি আপনার মাথায় শিং দিয়েছেন। পশু বানিয়ে দিয়েছেন। এ হলো আপনার পাপের সাজা। এখন আমাদের একজন ভালো জমিদার, দয়ালু জমিদার চাই। না-হলে আপনার মতো আমরাও একদিন শিংওয়ালা জানোয়ার হয়ে যাব। আপনি এই ঘরে বন্দি থাকুন। আমরা আজই আমাদের নতুন জমিদার খুঁজে নেব। এই বলে সবাই জমিদারের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তারা নায়েব মশাইকে জমিদারের চেয়ারে বসিয়ে দেয়। চারদিকে তখন নতুন জমিদারের নামে ধন্যি ধন্যি পড়ে যায়।
অলংকরণ :অভিজিত্ চৌধুরী
