আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বরিশালের বিভিন্ন নদ-নদীর অভয়াশ্রমে সব ধরনের মাছ শিকার ও জাটকা ইলিশের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে প্রশাসনের তেমন নজরদারি না থাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে জেলেরা। মাঝে মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নদীতে ট্রলার থেকে কিংবা সড়কে যাত্রীবাহী বাস, ট্রাকযোগে পাচার করা জাটকার ২/১টি চালান আটক হলেও জাটকা পাচারকারী চক্রের মূল হোতারা থাকে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। অভিযানকালে তাদের অধিকাংশই পালিয়ে যায়। পরে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে আবার ছোটো মাছ নিধনে নামে।
করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির মধ্যেই গত কয়েকদিন যাবত্ নগরীর বাজারগুলোতে ৩/৪ ইঞ্চি দীর্ঘ ইলিশের পোনা বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি জাটকা ইলিশও অবাধে বিক্রি হচ্ছে পাইকারি ও খুচরা বাজারে। বিগত বছরগুলোর মতো জেলার বিভিন্ন অভয়াশ্রমে গত ১ মার্চ থেকে দুই মাস সব ধরনের মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এগুলো হলো:বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা সংলগ্ন মেঘনার শাখা-প্রশাখা নিয়ে গঠিত অভয়াশ্রম, বরিশাল সদর উপজেলার কালাবদর নদীর হবিনগর পয়েন্ট থেকে মেহেন্দিগঞ্জের বামনীর চর পর্যন্ত ১৩ দশমিক ১৪ কিলোমিটার এলাকা, মেহেন্দিগঞ্জের গজারিয়া নদীর হাটপয়েন্ট থেকে হিজলা লঞ্চঘাট পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার এবং হিজলার মেঘনার মৌলভীরহাট পয়েন্ট থেকে মেহেন্দিগঞ্জ সংলগ্ন মেঘনার দক্ষিণ-পশ্চিম জাঙ্গালিয়া পয়েন্ট পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার এলাকা। পাশাপাশি নভেম্বর থেকে ৮ মাস জাটকা ইলিশ (২৫ সে. মি. এর ছোটো) ধরা, বিক্রি, মজুত ও পরিবহন করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয়দণ্ডের বিধান রয়েছে।
এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এ অঞ্চলের জেলেরা মাছ শিকার করলেও তাতে নেই প্রশাসনের তেমন কোনো নজরদারি। করোনা ভাইরাস সংক্রমণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ব্যস্ত থাকায় নদ-নদীতে অভিযান প্রায় বন্ধ থাকার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে অসত্ জেলে ও ব্যবসায়ীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মত্স্য কর্মকর্তারা জানান, করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির কারণে নদীতে তেমন একটা অভিযান পরিচালিত না হওয়ায় অবাধে শিকার হচ্ছে ছোটো আকারের মাছ। নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পাইকারি ও খুচরা বাজারে অবাধে এসব ছোটো মাছ বিক্রি হওয়ায় জেলেদের মধ্যে মাছ ধরার প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। পাইকারি মত্স্য অবতরণ কেন্দ্রে (পোর্ট রোডের মোকাম) প্রতিদিন সেখানে বিপুল পরিমাণ জাটকা বিক্রি হচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞার শুরু থেকেই নদ-নদী ও পাইকারি-খুচরা বাজারে জাটকা ইলিশ রক্ষা অভিযানে মত্স্য বিভাগ ও প্রশাসনের অভিযানে শিথিলতা থাকায় জাটকা নিধন ও বিক্রি বাড়তে থাকে। এতে করে চলতি মৌসুমে ইলিশের সংকট দেখা দিতে পারে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। চলতি মাসের শুরুর দিকে জাটকা পাচার রুট বলে পরিচিত নগর সংলগ্ন তালতলী এলাকা থেকে আট ব্যারেল ইলিশের পোনা উদ্ধারের পর মঙ্গলবার রাতে ১০০ মণ জাটকাসহ একটি ট্রলার আটক করে কোস্টগার্ড। এ দুটি অভিযানে বিপুল পরিমাণ জাটকা ইলিশ উদ্ধার হলেও কাউকে আটক করা যায়নি। এ অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া হিজলা কোস্টগার্ডের সি.সি মো. শামীম সাংবাদিকদের জানান, মঙ্গলবার রাতের অভিযানে হিজলার মেমানিয়া ইউনিয়নের মেঘনা নদী থেকে উদ্ধার করা জাটকা ইলিশসহ প্রায় ১০০ মণ মাছ বুধবার হিজলা মত্স্য অফিসের সহকারী জোসনা বেগমের উপস্থিতিতে বিভিন্ন এতিমখানায় ও গরীব অসহায় পরিবারের মাঝে বিতরণ করা হয়। অপরদিকে বৃহস্পতিবার ভোরে নগরীর কাশিপুর মাছ বাজারে জেলা মত্স্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাসের নেতৃত্বে ২৫ মণ জাটকা জব্দ করা হয়।
মত্স্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আজিজুল হক জানান, ইতিমধ্যে ‘কম্বিং অপারেশন-২০২০’ অভিযানে একাধিক মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অসত্ ব্যক্তিদের জেল-জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়াও মত্স্য বিভাগের কর্মকর্তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের উত্পাদন বাড়াতে জাটকা নিধন বন্ধ করা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। জাটকা নিধন বন্ধ না হলে ইলিশের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন তো দূরের কথা চলতি মৌসুমে ইলিশ সংকট দেখা দেবে।
