এক সপ্তাহ হয়ে গেল বাসায় বন্দি। মিজান সাহেব সোফায় বসে মোবাইল টিপছেন। গত সপ্তাহে দুইজন মক্কেলের দেখা করার কথা ছিল। একজনও আসেনি। শালারা করোনা ভাইরাসের দোহাই দেয়। অত টাকা বিকাশেও আনা যায় না। তাছাড়া বিকাশে প্রমাণ হয়ে থাকবে। মেজাজ খিটমিট করছে।
স্ত্রী অ্যানি আশেপাশেই। তারও মন-মেজাজ কোনোটাই ভালো না। বাসায় কাজের লোক নাই চারদিন। রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার আনারও কোনো উপায় নাই। যে কাজ জীবনে করেনি, তাই তাকে করতে হচ্ছে। থালাবাসন মাজা, ঘর ঝাড়ু দেওয়া—এও সম্ভব! ওদিকে পার্লারগুলো বন্ধ! কতক্ষণ ভালো লাগে!
নরমাল সময়ে দুজন যার যার জগতে থাকেন। সমস্যা হয় না। এখন বন্দি ঘরের ভেতরে মনে হচ্ছে পাশাপাশি দুটো তাজা বোমা ঘুরঘুর করছে। কখন টোকা লেগে বাস্ট হয় কে জানে!
মিজান সাহেব বললেন, এক কাপ চা বানাতে পারবে?
অ্যানি ড্রেসিংটেবিলের দিকে যেতে যেতে একটু গরম সুরেই বলল, বানিয়ে খাও।
মিজান সাহেবের পারদ সামান্য একদাগ উপরে উঠল। তিনি বললেন, আমি বানিয়ে খেলে তুমি আছ কী করতে, শুধু সাজতে?
অ্যানির পারদের দাগ সকাল থেকেই বিপত্সীমার কাছাকাছি ছিল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, সারা দিন রান্না, ঘর ঝাড়ু দেওয়া, থালা-বাসন পরিষ্কারের কাজ কে করে দেয়, তোমার মা, না বোন! তারপরও চা বানাতে বলো কোন আক্কেলে! বানিয়ে খেতে পারো না!
মিজান সাহেবের প্রতিউত্তর দেওয়ার কায়দাটা আলাদা। তিনি কখনো চিত্কার করেন না। ঠান্ডা মাথায় অন্যদিকে কাজ করতে করতে মোক্ষম খোঁচাটা মারেন। মনে হয় বুকের মাঝখানে খেজুরের কাঁটা বসিয়ে দেওয়া হইছে। তিনি বললেন, আসলে ভুল হইছে। গ্রাম থেকে একজন জোবায়দা বা রাশিদাকে আনলে জীবনটা অন্যরকম হতো।
আনলে না কেন? তখন তো মনে হইছে গইগেরামের একজন বিসিএস পাস করেছি। সুযোগ এসেছে। এবার শহরের বড়ো ঘরের মেয়ে বিয়ে করে দরিদ্রতার প্রতিশোধ নেব!
মিজান সাহেব কিছুক্ষণ উত্তর দিলেন না। তারপর গল্প করার মতো সুরে বললেন, যে কোনো চাকরিতে ঢোকানোর আগে সরকারের উচিত বিয়ে সম্পর্কে একটা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। সেই প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সামনে লেখা থাকবে, চকচক করিলেই সোনা হয় না। প্রশিক্ষকরা প্রথম ক্লাসেই বলবেন, ‘ক্লাবে ড্যান্স করা মেয়েদের সঙ্গে ড্যান্স করা যায়, জীবন শেয়ার করা যায় না!’
এবার অ্যানি কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে চোখে তীব্র একটা ভাষা এনে বলল, তার পাশেই আরেকটা প্রশিক্ষণকেন্দ্র থাকবে ভবিষ্যতের ঘুষখোরদের বিয়ে করার বিষয়ে। সেখানে লেখা থাকবে, ফকির বিয়ে করার ব্যাপারে সাবধান! প্রথম ক্লাসেই প্রশিক্ষক বলবে, ফকিরের চেয়ার যত বড়োই হোক, মন পড়ে থাকে পাটিতে!
অ্যানি দ্রুত হেঁটে ড্রেসিংটেবিলের উপর থেকে মোবাইল তুলে নিয়ে ফোন করল, ‘মাম্মি, এক্ষণ গাড়ি পাঠিয়ে দাও, আমি বাড়ি আসব।’
ওপাশ থেকে কী বলল শোনা গেল না। অ্যানি বলল, ড্রাইভারকে ছুটি দিয়েছ! সমস্যা নাই, রাস্তাঘাট একেবারে ফাঁকা। ড্যাডিকে বলো চালিয়ে আসতে। তা না হলে আমি এক্ষণ রাস্তায় বের হয়ে যাব!
নিস্তব্ধ চারিদিক। কিছুক্ষণ পরই বাড়ির সামনে গাড়ি থামার শব্দ। অ্যানি হাতব্যাগটি নিয়ে দরোজা খুলে ঝট করে বের হয়ে গেল। মিজান সাহেবের মাথা বিগড়ে আছে। তিনি বাধা দিলেন না। মোবাইল টিপতে টিপতেই বিড়বিড় করে বললেন, যাহ! সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে!
করোনা ভাইরাসের সমস্যা না যাওয়া পর্যন্ত কিচ্ছু বলা যাচ্ছে না ঘটনা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। আপাতত লকডাউন! অন্য বাড়িগুলোর ভেতর কী অবস্থা কেউ জানে না।
