পণ্যের উত্পাদন তথা কাঁচামালের উত্স, প্রয়োজনানুযায়ী প্রস্তুতকরণ, মজুতকরণ হইতে শুরু করিয়া গ্রাহক বা ভোক্তার নিকট পৌঁছানো পর্যন্ত যে শৃঙ্খলাবদ্ধ স্তর রহিয়াছে, তাহাকেই অর্থনীতির ভাষায় বলা হইয়া থাকে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, যাহাকে বাংলায় বলা যায় সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা। এই সাপ্লাই চেইনের মধ্যে সকল স্তর সঠিকভাবে পরিচালিত হইলেই কেবল কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা থাকে, পেশাদারিত্বের পরিচয় মেলে। সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা লক্ষ রাখেন কোন অঞ্চলে কী ধরনের পণ্য পাওয়া যায়, তাহার মান কী রকম, বাজারদর কী, শিপিং প্রসেস কী, ফ্রেইট রেট তথা পরিবহন খরচ কত, পরিবহনের পথ অবাধ কি না। অর্থনীতির এই পরিভাষাটি ১৯৮০-এর দশকে প্রথম ব্যবহার করিয়াছিলেন ব্রিটেনের ববুজ অ্যালেন হ্যামিল্টন করপোরেশনের কনসালট্যান্ট কেইথ অলিভার। কিন্তু মোটাদাগে এই সাপ্লাই চেইনের অস্তিত্ব ছিল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাসের শুরু হইতেই।
স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ চেইনে অস্থিরতা দেখা দিয়া থাকে। কখনো কখনো রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আমরা এই সাপ্লাই চেইন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত হইতে দেখিয়াছি। সরবরাহব্যবস্থায় অসাধু ব্যবসায়ী ও অপেশাদার ব্যক্তিদের বিশৃঙ্খলার কারণেও মাঝে-মধ্যে ছন্দপতন ঘটিয়া থাকে। কিন্তু বর্তমানে আসিয়াছে এক মহাদুর্যোগ, যাহাতে সরবরাহ চেইনের বিশৃঙ্খলা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, কোনো গোষ্ঠী এমনকি কোনো একক দেশের বা সম্প্রদায়ের সৃষ্ট নহে। আমরা দেখিতে পাইতেছি, উত্পাদিত খেতের তরমুজ খেতেই পড়িয়া রহিয়াছে, খামারের দুধে পানির দরেও গ্রাহক মিলিতেছে না, কৃষকের অন্যান্য অনেক ফসল গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছাইতেছে না (অনেক খাতে সরবরাহ চেইন রহিয়াছে, তবে আমরা বিশেষত কৃষির কথা এই মুহূর্তে ভাবিতেছি)। এই রকম অবস্থা চলিতে থাকিলে সাপ্লাই চেইন পুরোদস্তুর ভাঙিয়া পড়িবার আশঙ্কা রহিয়াছে। এই রকম অবস্থায় সরকারকেই সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হইবে। সরকারের পক্ষ হইতে সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনার সকল প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত জনবলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং তাহাদের নিয়ন্ত্রণ ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রণোদনার ব্যবস্থা করিতে হইবে। বাংলাদেশ মূলত কৃষি অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল একটি দেশ। এইখানে কাঁচামাল সরবরাহের প্রধান উত্স কৃষক ও তাহার ফসল। তাহারা ভঙ্গুর হইয়া পড়িলে পুরো কৃষিভিত্তিক সরবরাহ চেইন ভাঙিয়া পড়িবে। আমরা মনে করি, বর্তমান বিশেষ পরিস্থিতিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা সরকারের সার্বিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী তাহাদের সরকার সাপ্লাই চেইনের প্রত্যেক স্তরে সেবামূলক সম্পূরক শক্তি হিসেবে কাজে লাগাইতে পারে। এই মুহূর্তে দেশের যাবতীয় কার্যক্রম থমকাইয়া আছে। একের পর এক জেলা লকডাউনের সম্মুখীন। কিন্তু মনে রাখিতে হইবে, স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্যান্য জরুরি সেবার মতোই সরবরাহ চেইন অব্যাহত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, এই সরবরাহ চেইন এই সময়ে অব্যাহত না থাকিলে দেশের কৃষক সম্প্রদায়ের একটি বড়ো অংশ দুর্বল হইয়া পড়িবে, যাহার লম্বা প্রভাব পড়িবে কৃষিতে।
