প্রবাদ আছে, ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী’। চুরি করাই যাহাদের অভ্যাস, তাহাদের যতই ভালো ভালো উপদেশ দেওয়া হউক না কেন, তাহারা তাহা শুনিবে না। তাহারা মানুষের চরম অসহায়ত্বের সুযোগ লইয়াও অপকর্ম চালাইয়া যাইবে। বর্তমানে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে সারা বিশ্বেই চলিতেছে এক চরম ক্রান্তিকাল। এই মহামারিতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ক্রমেই বাড়িতেছে মৃত্যুর মিছিল। করোনা ভাইরাস হইতে মুক্তির আশায় বাংলাদেশের মানুষ রহিয়াছেন হোম কোয়ারেন্টাইনে। আজ আমরা কেবল করোনার চিন্তা ও আতঙ্কে বিভোর ও তটস্থ। এই সময় যাহারা দিনমজুর, দুস্থ ও অসচ্ছল তাহাদের জীবনধারণের জন্য সরকার ন্যায্যমূল্যে ও কমমূল্যে চাউল বিতরণের কর্মসূচি গ্রহণ করিয়াছেন; কিন্তু এই দুঃসময়েও একশ্রেণির লোক অসহায় ও গরিব মানুষের জন্য দেওয়া সেই চাউল আত্মসাত্ করিয়া লইতেছে। তাহাদের গ্রেফতার করিয়া আইনের হস্তে সোপর্দ করিতে হইবে। তাহাদের এই দুর্বৃত্তপনা বন্ধ না হইলে সরকারের মহতী উদ্যোগ মাঠে মারা যাইবে। এমনকি তাহাদের জন্য দেশে দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়াটাও অস্বাভাবিক নহে।
সংকটের এই সময়ে যাহারা দরিদ্র মানুষের চাউল আত্মসাত্ করিতেছে তাহারা গুরুতর অপরাধী। জানা যায়, গত বুধবার রাত্র হইতে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত তিন দিনে দেশের আটটি জেলায় অভিযান চালাইয়া ১ হাজার ৩০৪ বস্তা চাউল উদ্ধার করিয়াছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। উদ্ধারকৃত এই চাউলের পরিমাণ ৪০ হাজার ৮১৭ কেজি। ইহার মাঝে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ১০ টাকা কেজি দরের বিশেষ ওএমএস এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাউলও রহিয়াছে। মাত্র আটটি জেলার তিন দিনের এই চিত্র বলিয়া দিতেছে সারাদেশে এই মুহূর্তে এই ধরনের চাউল লইয়া কী ধরনের কারসাজি ও হরিলুট চলিতেছে। এই অপকর্মের সহিত জড়িত রহিয়াছে একশ্রেণির স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অসাধু ব্যবসায়ী। ঢালাও অভিযোগ আমরা করিতে চাহি না, তবে এই সকল লোকের যোগসাজশ ছাড়া বস্তার পর বস্তা চাউল পাচার করা অসম্ভব। সরকারি এই চাউল পাওয়া যাইতেছে ভাঙাড়ির দোকানে, ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত গুদামে, চৌকিদারের বাড়িতে, মানুষের বাড়িতে বাড়িতে, এমনকি কালোবাজারে। শুধু গুদাম হইতে উদ্ধার করা হইতেছে এমন নহে, পাচারকালে পথেঘাটে বিভিন্ন পরিবহন হইতেও এই সকল চাউল জব্দ করা হইতেছে। অনেককে আটক করিয়া জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা করা হইতেছে।
করোনা ভাইরাসের উপদ্রবের কারণে অনেকের আয়-রোজগার বন্ধ হইয়া গিয়াছে। এই পরিস্থিতি আরো কতদিন বজায় থাকিবে তাহা কেহ জানেন না। এইজন্য সরকার এই আপত্কালে সারাদেশে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ওএমএস, সাধারণ ত্রাণ, কাবিখাসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করিয়াছে। এই সকল চাউল খাদ্য অধিদপ্তরের সিলযুক্ত বস্তায় যাইতেছে। এইজন্য কোথাও কোথাও চাউলের বস্তারও পরিবর্তন করা হইতেছে। লকডাউন অবস্থায় মাদারীপুরের শিবচরেই ঘটিয়াছে এমন ঘটনা। ইহা ‘কারো পৌষ মাস ও কারো সর্বনাশ’-এর ন্যায় পরিস্থিতি তৈরি করিয়াছে। ইহার রাশ টানিয়া ধরিতে হইলে সারাদেশের স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবশ্যই আরো তত্পর রাখিতে হইবে।
