আমাদের বিশ্বমানের গবেষণা করতে হবে

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২০, ২১:০১

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

পৃথিবীকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে এই সময়টাতে যখন সারা পৃথিবী করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়ছে, তখন এটির প্রতিকারের উপায় খুঁজতে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। মার্কিন বিজ্ঞানীরা ‘এমআরএনএ-১২৭৩’ নামের করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের টিকা আবিষ্কার করেছেন বলে খবরে এসেছে। শারীরিকভাবে সুস্থ ও স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণকারী ১৮ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে বিভিন্ন বয়সের মোট ৪৫ জনের ওপর এই প্রতিষেধক পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হবে। প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে চলবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ। তার পরেই এই পরীক্ষা সফল কি না, তা জানা যাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি, পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিষেধক টিকা দেওয়ার প্রথম ধাপ শুরু হয়েছে। ইতিহাসে এত দ্রুত কোনো প্রতিষেধক টিকা প্রয়োগের নজির নেই। এমনকি কাছাকাছিও নেই। অ্যান্টি ভাইরাল থেরাপি ও অন্যান্য চিকিত্সা পদ্ধতি আবিষ্কারের চেষ্টাও আমরা চালিয়ে যাচ্ছি।’ যে কোনো আবিষ্কার ও গবেষণার মৌলিক ফলাফল সে দেশের অর্জন ও গৌরবের বিষয়। এই দৃষ্টান্ত টানার মূল উদ্দেশ্য একটু ভিন্ন। সেটি হলো সারা বিশ্ব যখন একটি ক্রিটিক্যাল ক্রাইসিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন অনেক বিজ্ঞানী ও গবেষক সেটি থেকে কীভাবে বের হয়ে আসা যায়, তার জন্য দিন-রাত গবেষণা করে চলেছেন। অচেনা ভাইরাসটির খুঁটিনাটি নানা তথ্য ও উপাত্ত বের করার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার মানে, চলমান ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষকে চিকিত্সকেরা বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। সঙ্গে সঙ্গে আরেক দল মানুষ এটা স্থায়ীভাবে নির্মূল করার গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন। এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়; চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ইসরাইল, কানাডাসহ অনেক দেশের গবেষকেরা করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারের দাবি করেছেন। করোনা ভাইরাসে সংক্রমণের এই স্বল্প সময়ে অনেকগুলো গবেষণালব্ধ রিসার্চ পেপার বিভিন্ন নামীদামি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের গবেষকেরা কি করোনা ভাইরাস নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন? হয়তো উত্তরটা কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া নেতিবাচক হওয়ার কথা। বর্তমানে করোনা ভাইরাসকে কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, তার ব্যবস্থাপনা ও চিকিত্সা নিয়ে ভাবলেও সঙ্গে সঙ্গে এটি নিয়ে যে গবেষণা করা দরকার, সেটি আমরা ভেবে দেখছি। এখানেই উন্নত বিশ্বের সঙ্গে আমাদের গবেষণার পার্থক্য। একটি চলমান সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য উন্নত ও প্রযুক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ যেমন প্রচেষ্টা চালায়, তেমনি সেটি কীভাবে পরিকল্পিত গবেষণার মাধ্যমে নির্মূল করা যায়, সে বিষয়গুলো নিয়েও ভাবে। আমরা ভাবতে পারছি না, এর কারণ হলো গবেষণাকে উন্নত বিশ্ব সংস্কৃতির একটি অপরিহার্য অংশ বলে বিবেচনা করলেও আমরা গবেষণাকে সংস্কৃতির পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারিনি। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন আমাদের দেশে বসেই জগদীশ চন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহা, পি সি রায়, ড. মাকসুদুল আলম, ড. কুদরত-ই-খুদা, ড. আতাউল করিম, শুভ রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর উন্নত দেশের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গবেষণা করে গেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশে গবেষণা করার মনসিকতা বাড়েনি, বরং কমেছে। এর কারণ হলো, গবেষণাকে প্রাধান্য দেওয়ার পরিবর্তে আমরা অন্য দেশের আবিষ্কার ও গবেষণার ফলাফলের ওপর পরশ্রীকাতর মনোভাব পোষণ করেছি। হাত-পা ছেড়ে দিয়ে উন্নত বিশ্ব কী গবেষণা করে, তার ওপর নির্ভর করেছি। কিন্তু নিজেদের গবেষণাকে সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে গবেষণার মানসিকতাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরের কৌশল গ্রহণ করতে পারিনি। এখানেই আমাদের ব্যর্থতা। তবে এই ব্যর্থতা থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে আমাদের গবেষণাকে উন্নত রাষ্ট্রের আদলে নিয়ে এসে নতুন করে সাজাতে হবে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিখাদ সত্য একটি কথা বলেছেন, তা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাদান হলো গৌণ, নতুন শিক্ষার উদ্ভাবন হলো মুখ্য। এ কথার অর্থ হলো, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে হবে। এখানকার শিক্ষকদের নিজেদের কেবল শ্রেণিকক্ষে গতানুগতিক শিক্ষাদানের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, বরং গবেষণামনস্ক চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও গবেষণার মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে।

গবেষণাবিমুখতার ক্ষেত্রে কেবল শিক্ষকদের দোষারোপ করলেই সমস্যার সমাধান আসবে না, বরং সমস্যার সমাধানে সরকারকে গবেষণাকেন্দ্রিক জাতীয় নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। যে নীতিমালায় গবেষণার সুযোগ-সুবিধা যেমন সৃষ্টি করা যাবে, তেমনি একজন গবেষককে কীভাবে অনুপ্রাণিত করা যায়, তার বিভিন্ন উপাদান বিবেচনায় আনতে হবে। আমাদের দেশে নাসার মতো সুসংবদ্ধ কোনো রিসার্চ ওরিয়েন্টেড প্রতিষ্ঠান নেই, যেখানে বহুমাত্রিক কাল্পনিক বা বাস্তব চিন্তাসমূহের বিশ্লেষণ করে নতুন উদ্ভাবনকে অনুপ্রাণিত করা যায়। এমন একটি সার্বজনীন প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশে দরকার। গবেষণা প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে। এর একটি হলো মৌলিক গবেষণা, অন্যটি হলো ফলিত গবেষণা। ফলিত গবেষণার প্রতি আমাদের আগ্রহ থাকলেও মৌলিক গবেষণা তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। ফলিত গবেষণার সঙ্গে সঙ্গে মৌলিক গবেষণার প্রতি কীভাবে মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা যায়, সেটির কৌশল ও সুবিধা তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করা দরকার। আমরা খুব বেশি গতানুগতিক গবেষণার ধারণা নিয়ে এখনো পেছনে পড়ে আছি। সব সময় আমরা বলি, দেশের কাজে লাগে এমন কোনো গবেষণা আমাদের করতে হবে। এটি ঠিক যে গবেষণার মাধ্যমে আমাদের দেশীয় সমস্যার সমাধান করতে হবে। তবে এটি কোনোভাবেই বিশ্বমানের গবেষণা হতে পারে না। অনেক সময় আমরা প্রজেক্ট ওরিয়েন্টেড কাজকে গবেষণার পর্যায়ে ফেলে ভ্রান্ত ধারণা প্রচার করি। যেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। পৃথিবী এগিয়েছে, প্রযুক্তি এগিয়েছে তার থেকে অনেক বেশি। আজকের দিনে আমাদের গবেষণাকে বিশ্বমানে পৌঁছাতে হলে হার্ভার্ড, কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড, এমআইটি ও নাসার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এগোুতে হবে। তারা কী কী ধরনের গবেষণা করছে, তা আমাদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এর সঙ্গে তাদের গবেষণা থেকে আমরা কীভাবে আরো বেশি আধুনিক গবেষণা করতে পারি তার বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ফেলোশিপ আমাদের দেশের গবেষণাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এই ফেলোশিপ বাইরের দেশে পড়ার জন্য না দিয়ে আমাদের দেশে পিএইচডি ও মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের দিতে পারলে গবেষণার ক্ষেত্রে দুটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। এই ফেলোশিপের আওতায় বিদেশের সমপরিমাণ সুবিধা পেলে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা ডেপুটেশন বা শিক্ষা ছুটি নিয়ে কিংবা পূর্ণকালীন ছাত্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সার্বক্ষণিকভাবে গবেষণা করতে পারত। এতে দেশের গবেষণা আরো সমৃদ্ধ হতো এবং এর সঙ্গে বিদেশি ডিগ্রির প্রতি আমাদের গতানুগতিক পরশ্রীকাতরতা কমত। অন্যটি হলো, আমাদের দেশের শিক্ষকেরা এর ফলে পূর্ণকালীন গবেষণা করানোর মতো প্রতিভাধর শিক্ষার্থীদের পেতেন। নিবিড়ভাবে এই শিক্ষার্থীদের গবেষণার ক্ষেত্রে পরিচর্যা করে মৌলিক গবেষণার ধারণা সৃষ্টি করতে পারতেন। সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের এ ধরনের ডিগ্রি প্রদানের ক্ষেত্রে মেধা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বাড়ত। নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ধারণা পেয়ে দেশ উপকৃত হতো। দেশের অর্থ দেশেই থেকে যেত। এভাবেই ক্রমাগত দেশ গবেষণা চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়ে একদিন বিশ্বমানে পৌঁছাত। গবেষণার ক্ষেত্রে আমরা আর স্বপ্ন দেখতে চাই না। বরং স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরিত করতে চাই।

n লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর