রেভারেন্ড মার্টিন অধিকারী
বিশ্ব মানব-পরিবার, আমরা এখন যে মৃত্যুচ্ছায়ার এক উপত্যকা দিয়ে চলছি তা আমরা অচিরেই পার হয়ে যাব। বিধাতার প্রতি এমন গভীর বিশ্বাস ও মানুষের প্রতি এমন প্রত্যয় আমাদের আছে। কারণ আমরা মানুষ, স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, তার মুকুট। প্রসঙ্গত ‘করোনা ভাইরাস’ নামটির প্রথম অংশ, অর্থাত্ ‘করোনা’ শব্দটি নেওয়া হয়েছে ল্যাটিন ভাষার ‘করোনাম’ থেকে যার অর্থ ‘মুকুট’! কারণ এ ভাইরাসটি দেখতে অনেকটা ‘মুকুট’ এর মতো।
স্রষ্টা মানুষকে অপার সম্ভাবনা, মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তিনি তার নৈতিক ও আত্মিক গুণাবলি আমাদের দান করেছেন, দিয়েছেন তার সৃষ্টির ওপরে পবিত্র সামাজিক দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকার। আমরা আশ্চর্যরূপে ও ভয়াবহরূপে নির্মিত। মানবদেহ গঠিত হয় কমপক্ষে ষোলো প্রকারের রাসায়নিক ও খনিজ অনুপান দিয়ে; তার দেহের মধ্যে আছে কোটি কোটি কোষ।
কিন্তু মানুষ আজও প্রকৃতির ওপরে তার অধিকার ও ক্ষমতা লাভ করতে সক্ষম হয়নি। বরং সে প্রকৃতির ক্ষমতা ও শক্তির কাছে অতি ক্ষুদ্র। কারণ স্রষ্টার মহত্ত্ব, পবিত্রতা ও ন্যায্যতাকে সে লঙ্ঘন করে চলেছে। স্রষ্টার সুন্দর ও উত্তম সৃষ্টি প্রকৃতি নিরপেক্ষ হলেও তা বিরূপ। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এত জয়জয়কার থাকলেও শত রকমের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি ইত্যাদির ওপরে আজও মানুষের ক্ষমতালাভ সম্ভব হয়নি। তার ওপর আবারও আছে মানুষের পাপাচার ও ঈশ্বরের প্রতি অবাধ্যতা, মানুষে মানুষে হিংসা এবং সমস্ত সৃষ্টির প্রতি অবহেলা ও তার অপচয় এবং অপব্যবহার। প্রকৃতির সব কিছুকেই সে তার জাগতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম ও ভোগ-বিলাসের জন্য যেমন খুশি তেমনি ব্যবহার করে চলেছে। দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে, গোত্রে গোত্রে সংঘটিত হচ্ছে যুদ্ধ, উজাড় হচ্ছে প্রকৃতি ও তার সম্পদ। সব কিছুরই তো একটা সীমা আছে। সীমা আছে পৃথিবীর সব সম্পদেরও। মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে অসংযমী মানুষের ভোগ, অতিরিক্ত চাপ পড়ছে সম্পদের ও সামর্থ্যের ওপর। নৈতিকতার প্রশ্নে বলতে হবে যে, মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে মানুষের মধ্যে অসত্য, অধর্ম, অশুভ প্রতিযোগিতা। এসবের একটা ফল, তা বিজ্ঞানের ভাষায় বলি বা ঈশতত্ত্বের ভাষায় বলি, যে থাকবে তা বলতে হবে।
তবে বিশ্ব সংসারের সার্বভৌম স্রষ্টা, প্রভু ও প্রতিপালক করুণাময়। তিনি আমাদের প্রার্থনা শ্রবণকারী ও পরিত্রাতা। তিনি মঙ্গলময় বলে আমাদের উত্তম পথ দেখিয়ে দেন। আমরা যদি নম্রতায় ও সরলতায় তার দিকে ফিরে আসি ও প্রার্থনা করি তাহলে তিনি ঐ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কিটের আঘাত থেকে আমাদের পথ দেখিয়ে উদ্ধার করবেন, থামিয়ে দেবেন তিনি মানব-নিধনের জন্য ঐ মৃত্যুদূতের অভিযান। কিন্তু আমাদের বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে শুনতে হবে স্রষ্টার কথা, পালন করতে হবে তার কল্যাণ বাণী। নীরবঘাতক করোনাসহ অন্য সকল বিপদ মানুষের প্রতি ঈশ্বরের লাউডস্পিকার!
বিশ্বব্যাপী ঈশ্বরভীরু সকল মানুষই নিজ নিজ ধর্মমতে স্রষ্টার কাছে তাদের প্রার্থনা বা উপাসনার অর্ঘ নিবেদন করে চলেছেন, এ কথা কে না জানেন? কোটি কোটি ভক্তের আর্তি অবশ্যই তিনি শুনবেন, আর বিশ্বমানব পরিবারকে তিনি আশীর্বাদ করবেন। পৃথিবীতে অনেক সত্, সরল ও ন্যায়বান মানুষও আছেন। করোনা প্রসঙ্গে আমাদের প্রার্থনার অনেক বিষয় আছে। এখানে আমি মাত্র তিনটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই—
প্রথমত : করোনার প্রতিষেধক ও তার চিকিত্সার ওষুধ তৈরির জন্য যারা গবেষণা করছেন ঈশ্বর যেন তাদের এক্ষেত্রে সাফল্য দান করেন;
দ্বিতীয়ত : করোনায় আক্রান্তদের যেসব চিকিত্সক ও সেবাদানকারী অনেক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন তাদের যেন ঈশ্বর সুরক্ষা দেন;
তৃতীয়ত : লাখ লাখ দরিদ্র মানুষের সাহায্যের জন্য যারা বিভিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তারা যেন সততা সহকারে তাদের এ পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
n লেখক :খ্রিষ্টীয় ঈশতত্ত্বের শিক্ষক ও সমাজকর্মী
