মহামারী নভেল করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের পর মৃত্যুতেও ইতালিকে ছাড়িয়ে এখন শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে শুক্রবার এক দিনেই মারা গেছে ২ হাজারের বেশি মানুষ। আর গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মারা গেছে ১ হাজারের বেশি। কোভিড-১৯ হানার পর বিশ্বে ২৪ ঘণ্টায় এত মৃত্যু আর কোনো দেশে হয়নি। ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের শারীরিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। ভারতে লকডাউনের মেয়াদ আরো দুই সপ্তাহ বাড়িয়েছে সরকার। তবে ইউরোপের কিছু দেশে শিথিল করার খবর পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, লকডাউন দ্রুত তুলে নিলে ভবিষ্যতে করোনায় বিপদ বাড়তে পারে। গতকাল বিশ্বে ১৭ লাখ ৬১ হাজার ও ১ লাখ সাড়ে সাত হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আর ইতালিতে মারা গেছে ১৯ হাজার ৪৬৮ জন। স্পেনে মৃত্যু হয়েছে ১৬ হাজার ৩৫৩ জনের। যদিও জনসংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্র ইতালির জনসংখ্যার পাঁচ গুন এবং স্পেনের সাতগুন। গতকাল রাত সাড়ে ১২ টায় ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডো মিটার থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে ২০ হাজার ৬৯ জনের প্রাণহানি হয়েছে করোনা আক্রান্ত হয়ে। শনিবারই মরার খবর পাওয়া গেছে ১ হাজার ৩২২ জনের। দেশটিতে মোট আক্রান্ত হয়েছে ৫ লাখ ২১ হাজার ৮১৬ জন। ফলে আক্রান্তের শীর্ষেও যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ৩০ দিন পর যদি ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সবকিছু যুক্তরাষ্ট্রে খুলে দেওয়া হয় তাহলে দুই লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজার ১০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এক দিনে মৃত্যু সংখ্যার নিরিখে যা এখনো পর্যন্ত সর্বোচ্চ। গত চার মাসে বিশ্বের আর কোনো দেশে এক দিনে এত সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির রেকর্ড নেই। এর মধ্যে নিউ ইয়র্কের পরিস্থিতিই সবচেয়ে সংকটজনক। সেখানে করোনায় আক্রান্ত ১ লাখ ৮০ হাজার ৪৫৮ জন। ইতিমধ্যেই প্রাণ গেছে ৮ হাজার ৬২৭ জনের। তারপরই রয়েছে নিউ জার্সি। ৫৮ হাজারের বেশি আক্রান্তের মধ্যে ২ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, আমরা প্রথম দিকে ১ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করেছিলাম। কিন্তু আমাদের কঠোর পদক্ষেপে অনেক মানুষের জীবন বেঁচে যাবে।
বরিসের অবস্থার দ্রুত উন্নতি
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের শারীরিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। শুক্রবার তার অফিস ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট এই তথ্য জানিয়েছে। দেশটির মিডিয়া জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বরিস এখন হাঁটতে পারছেন। তিনি চলচ্চিত্র দেখছেন এবং তার অন্তঃসত্ত্বা পার্টনারের পাঠানো চিঠিও পড়ছেন। এদিকে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার ২৪ ঘণ্টায় ৯১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে ৯ হাজার ৮৭৫ জনে। দেশটিতে ১৯ জন স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। ফলে পিপিই’র সংকট নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচনার মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল কোথাও সংকট থাকলে দু:খ প্রকাশ করেছেন। এদিকে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ইস্টার বার্তায় আবারো দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, করোনা ভাইরাস আমাদেরকে পরাজিত করতে পারবে না।
ভারতে লকডাউন বেড়েছে
ভারতে লকডাউনের মেয়াদ ছিল ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত। কিন্তু আরো দুই সপ্তাহ অর্থাত্ ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত লকডাউন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গতকাল সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সেই বৈঠকের পর ঐ সিদ্ধান্তের কথা টুইট করেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। গোটা দেশকে তিনটি জোনে ভাগ করে হবে লকডাউন। স্থানভেদে বদলাবে নিয়মকানুনও। এর কিছু পরেই পৃথকভাবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানোর কথা ঘোষণা করেন কর্নাটকের মু্খ্যমন্ত্রী বিএস ইয়েদুরাপ্পা ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তবে এই মর্মে সরকারি ঘোষণা স্থানীয় শনিবার সন্ধ্যা কিংবা আজ রবিবার সকালে হতে পারে। লকডাউনের এই পরিবেশে আর্থিক মন্দা ও জীবিকা নির্বাহ একটা অংশের কাছে বড়ো উদ্বেগের কারণ। সেই উদ্বেগ দূর করতে প্রধানমন্ত্রী মোদি মুখ্যমন্ত্রীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমার প্রথম ভাষণে আমি উল্লেখ করেছিলাম আগে জীবন, তারপর অর্থনীতি। আজ আমি বলছি, জীবন আর জীবিকা দুটোই বাঁচিয়ে চলতে হবে’। কৃষিক্ষেত্রে একাধিক সংস্কার এনে খাদ্য পণ্য উত্পাদনে জোর দিতে মুখ্যমন্ত্রীদের কাছে আবেদন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশটিতে আক্রান্ত ৭ হাজার ৫২৯ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ২৪২ জনের।
লকডাউন নিয়ে সতর্কবার্তা হুর
আগামী সপ্তাহে লকডাউন শিথিল করতে যাচ্ছে অস্ট্রিয়া। ১৫ এপ্রিল থেকে স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টারগুলো খুলে দিতে যাচ্ছে ডেনমার্ক। সামাজিক দূরত্বে আরোপিত বিধিনিষেধ এপ্রিলের ৯ তারিখেই কিছুটা শিথিল করেছে চেক রিপাবলিক। ১৪ তারিখ থেকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পরিকল্পনাও আছে। লকডাউন অব্যাহত থাকলেও ইউরোপের দেশ ইতালি ও স্পেন বেশকিছু পদক্ষেপ শিথিল করেছে। এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) জানিয়েছে, সংস্থাটির প্রধান টেড্রোস অ্যাধনম ঘেব্রেইয়েসাস সতর্ক করেছেন, বিশ্বব্যাপী যদি সামাজিক দূরত্বের কড়াকড়ি খুব তাড়াতাড়ি তুলে নেওয়া হয় তাহলে করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ বিস্তার ঘটতে পারে। জেনেভায় একটি সম্মেলনে টেড্রোস বলছেন, খুব দ্রুত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে নেওয়া হলে করোনা ভাইরাস ভয়ংকরভাবে ফিরে আসতে পারে।
অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি
স্পেনে ১৮ দিনের মধ্যে সবচেয়ে কম মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দেশটিতে ২৪ ঘণ্টায় ৫১০ জনের প্রাণ গেছে। গত ২৩ মার্চের পর এটাই সর্বনিম্ন। জার্মানিতে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৭৩৬ জন। নভেল করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৫৩০ জন। তবে করোনার প্রকোপ কাটিয়ে ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরছে চীন। শুক্রবার নতুন করে ৪৬ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে সেখানে। ২৪ ঘণ্টায় ৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন দেশটিতে। তুরস্কে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে প্রধান শহরগুলোতে ৪৮ ঘণ্টার কারফিউ ঘোষণা করেছে সরকার। সবমিলিয়ে গোটা বিশ্বে ১ লাখ ৪ হাজার ৭৭৫ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছে ১৭ লাখ ২২ হাজার ৩০৬ জন।
