এই করোনার কালবেলায় সকলেই যেন একেকজন বিশেষজ্ঞ হইয়া উঠিয়াছেন! সকলেই যেন সাংবাদিক হইয়া উঠিয়াছেন! সকলেই হইয়া উঠিয়াছেন স্পেশাল নিউজের আবিষ্কর্তা! এই জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুড়িয়া দেখা যাইতেছে গুজব ও ফেক নিউজের ছড়াছড়ি। যেই কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস অ্যাডহ্যানম সম্প্রতি বলিয়াছেন, তাহাদের কেবল করোনা ভাইরাসের মহামারির সঙ্গেই নহে, লড়াই করিতে হইতেছে ‘ইনফোডেমিক’ বা ভুয়া খবরের মহামারির সঙ্গেও।
আমাদের মানসজগতের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হইল, আমরা যতখানি সন্দেহ করি তাহার চাইতেও অতি সরলভাবে যে কোনো কিছু বিশ্বাস করিয়া ফেলি। ইতিপূর্বে পিউর করা একটি জরিপে দেখা গিয়াছে, ২৩ শতাংশ আমেরিকান কোনো না কোনো একটি কারণে মিথ্যা সংবাদ শেয়ার করিয়া থাকেন। যখন কোভিড-১৯ লইয়া অসত্য ও বিভ্রান্তিপূর্ণ নিউজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসিতে থাকিল তখন মাত্র ৩০ শতাংশ লোক বুঝিতে পারেন যে এইগুলি ভুয়া। অর্থাত্ ৭০ শতাংশ মানুষই নিউজটাকে সত্য বলিয়া মনে করেন। এই ব্যাপারে কোনো কোনো গবেষক মনে করেন—আমরা যখন কোনো কিছু দেখি, প্রথমেই চাই খবরটাকে বিশ্বাস করিতে। এই কারণেই ভুয়া খবর শেয়ারের নিরন্তর স্রোত থামিতেছে না কিছুতেই। কোথাও ভুয়া খবর ছড়ানো হইতেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিজ্ঞপ্তির আকারে, যাহাতে বলা হইতেছে, আইসক্রিম বা শীতল খাদ্য খাইবেন না বা ঘনঘন উষ্ণ লবণপানিতে গার্গল করিলেই ভাইরাসটি হইতে সুরক্ষিত থাকিবেন। কণ্ঠনালিতে উহা চার ঘণ্টা অবধি থাকে। ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা দুনিয়ার কোনো চিকিত্সকই এই সকল কিছু বলেন নাই। কেহ বলিতেছেন ঘনঘন কাপড় কাচিতে হইবে, কেহ বলিতেছেন ভিটামিন-সি ও লেবুর রস খাইতে হইবে। কিছু নিউজে দেখা যাইতেছে, চীনে ভাইরাসে আক্রান্তদের গুলি করিয়া হত্যা করা হইয়াছে। ভিডিওগুলি হয় পুরাতন, নয়তো কোনো সিনেমার দৃশ্য। ফেসবুক, মেসেঞ্জার এবং হোয়াটসঅ্যাপে এই সকল নিউজের স্রোত দিনদিন বাড়িতেছে। মানুষ কিন্তু এই সকল তথ্য ভালো মনে করিয়াই তাহার কাছের মানুষদের নিকট শেয়ার করিতেছেন। বলা যায়, মানুষ একরকম নিঃস্বার্থভাবেই মিথ্যা রটাইতেছেন।
এই অবস্থা কেবল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে নহে, প্রথম বিশ্বেও ইহা সমানতালে বহমান। সম্প্রতি ব্রুনো কেসলার নামে এক গবেষক বলিয়াছেন, মার্চে প্রতিদিন ৪৬ হাজার নূতন পোস্ট টুইট করা হইয়াছে, যাহা কিনা কোনো না কোনোভাবে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে অসত্য এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করা হইয়াছে। আসলে পরিস্থিতি যত খারাপ হইতেছে, মানুষ তত বেশি আতঙ্ক বোধ করিতেছে এবং গৃহে অন্তরীণ অবস্থায় সারাক্ষণ অনলাইনে বুঁদ হইয়া থাকিতেছে এবং নিজের অজান্তে এই সকল মিথ্যা তথ্যকে আঁকড়াইয়া ধরিতেছে। প্রশ্ন হইল, কী করিয়া তাহা হইলে এই সকল ভুল খবর হইতে বিশ্বাসযোগ্য খবরকে আলাদা করা যাইবে? এই ক্ষেত্রে প্রথম এবং সহজ কথা হইল, অথেনটিক সোর্স হইতে নিউজটি আসিয়াছে কি না, তাহা না বুঝিয়া কোনো চটকদার নিউজ শেয়ার না করা। সুতরাং সকলে সাবধানে থাকুন, গুজব হইতে দূরে থাকুন।
