কোভিড-১৯ ভাইরাস যেভাবে বদলে দেবে বিশ্বব্যবস্থা

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২০, ২০:৪৭

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

বিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব বেশ কয়েকবার ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। বিশ্ব পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ বড়ো দুই ঘটনা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার কর্তৃত্বের পতন হয়ে উত্থান ঘটে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের। এই বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর আন্তর্জাতিক রাজনীতির পড়াশোনায় আবির্ভাব ঘটে উদারবাদী তত্ত্বের। উড্রো উইলসনের বিখ্যাত ১৪ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে যুদ্ধ পরিহার করে শান্তির পক্ষে বিশ্ব একমত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৫-এর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্বেকার সব পরিবর্তনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। নতুন পরিবর্তনে সারা বিশ্বে ব্রিটেন, ফ্রান্সের উপনিবেশ ভেঙে পড়ে। বিশ্ব রাজনীতিতে উত্থান হয় নতুন মোড়ল আমেরিকা ও রাশিয়ার। উদারবাদী তত্ত্বকে ব্যর্থ দাবি করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উত্থান ঘটে বাস্তববাদী তত্ত্বের। জাতিসংঘ গঠনসহ নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রগুলো সামরিক খাতে বিনিয়োগ বাড়ায়। পরবর্তীকালে ৭০ ও ৮০-এর দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নব্য উদারবাদ ও নব্য বাস্তববাদের উত্থান ও সমন্বয় ঘটে। ফলে বেশ কিছু আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সামরিক জোট গঠন হয়। ঠান্ডা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আলোচনায় আসে ‘ক্লাশ অব সিভিলাইজেশ্যন’ তত্ত্ব। নাইন-ইলেভেন হামলার পর পুরো বিশ্ব জুড়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও ইসলামোফোবিয়া মারাত্মক বিস্তার লাভ করে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর সব পরিবর্তনকে ছাড়িয়ে যাবে বিশ্ব জুড়ে মহামারি কোভিড-১৯-এর বিস্তার ও রোধকল্পে বিশ্বের ব্যর্থতা। কোভিড-১৯-এর বিস্তার ইউরোপ-আমেরিকাসহ পরাক্রমশালী দেশসমূহের সক্ষমতাকে প্রশ্নবৃদ্ধ করেছে। যে ইতালি সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে ওস্তাদ, সে ইতালি তার নাগরিককে বাঁচাতে পারেনি। ফ্রান্স জার্মানি আত্মসমর্পণ করেছে।  বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ রাজপরিবারের উত্তরসূরি প্রিন্স চার্লসকে এই ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে পারেনি ব্রিটেন। আক্রান্ত হয়েছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও। এত বড়ো মহামারির দিনে বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে পায়নি ইউরোপ। ইউরোপ দেখল ন্যাটো জোট, মিসাইল তাকে বাঁচাতে পারছে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ একে অপরের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ। ফলে ন্যাটো জোট, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ  সম্পর্ক  হুমকির মুখে পড়বে।

কোভিড-১৯ যখন চীনে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল তখন এসব দেশ ভাবতেও পারেনি পরবর্তী ‘হটস্পট’ হতে যাচ্ছে আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়। চীন এত দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে বহিঃবিশ্বে সহযোগিতা নিয়ে যাবে এটাও অকল্পনীয় ছিল। এই ভাইরাস বৈশ্বিক সম্পর্কে বদল ঘটিয়েছে। মহামারি মোকাবিলায় চীন ও জাপান ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। আইএমএফের কাছে সাহায্য চেয়েছে ইরান। অর্ধশত বছর ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় থাকা কিউবা ইতালিতে ডাক্তার পাঠিয়ে প্রমাণ করেছে বন্ধুত্বের জন্য সামরিক জেট বিমান নয় ডাক্তারই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বিশ্বব্যাপী শত্রুমিত্রের ধারণা বদলে যাবে।

 যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ নয় শুধু তার কর্তৃত্বে থাকা অন্যান্য দেশের পাশেও দাঁড়াতে পারেনি। অন্যদিকে চীন নিজ দেশের পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বহির্বিশ্বে ডাক্তার ও মেডিক্যাল সরঞ্জাম নিয়ে রওনা দিয়েছে। এছাড়া চীনা আলিবাবা বাংলাদেশসহ এশিয়া, ইউরোপের অর্ধ শতাধিক দেশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। পরবর্তী সময়ে আলিবাবা জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে কোনো সন্দেহ নেই। করোনা পরবর্তী বিপর্যস্ত পৃথিবীতে নিয়ন্ত্রণের লড়াই নিয়ে আমেরিকা-চীনের মধ্যে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হবে। স্নায়ুযুদ্ধে চীন আপাতত এগিয়ে থাকলেও ভাইরাস সংক্রমণে চীনের দায়কে বারবার বিশ্বকে মনে করিয়ে দিতে চাইবে যুক্তরাষ্ট্র। সে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট করোনা ভাইরাস না বলে  বলছে ‘চাইনিজ ভাইরাস’।

এতদিন বিশ্ব বাজেট করেছে যুদ্ধের জন্য, শান্তির জন্য নয়। কিন্তু এবার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় শক্তিশালী অনেক দেশকে এবার মাস্ক ও সাধারণ মেডিক্যাল যন্ত্রপাতির জন্য অন্য দেশের দিকে হাত বাড়াতে হয়েছে। ফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সহযোগিতা অনেক ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সামরিক খাতের গুরুত্ব কমিয়ে আনবে। মানুষ দীর্ঘদিন ঘরে বন্দি। এই বন্দিত্ব বাড়বে। কিন্তু মানুষ কতদিন ঘরে বসে থাকবে! মানুষ যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। বাড়িতে অফিস করা, স্কাইপিতে ইন্টারভিউ, মিটিং সেরে নেওয়াতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। এসব অভ্যস্ততা মানুষকে করোনা পরবর্তী সময়ে অফিসের ধারণা পালটে দিতে পারে।  বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের স্কুল-কলেজ বন্ধ। এরই মধ্যে বাংলাদেশের একটি টিভি চ্যানেলে মাধ্যমিকের ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। এভাবে বন্দিত্ব বাড়তে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনলাইনে ক্লাস, লেকচার এমনকি পরীক্ষা নেওয়ার কথাও ভাববে বিশ্ব। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজবের বিস্তার পরবর্তীতে এই খাতে সেন্সরশিপে ভাবনাকে সামনে নিয়ে আসবে।  

অনলাইনে মানুষের কেনাকাটা বাড়বে। সামনের ঈদ পর্যন্ত যদি এই সংক্রমণ চলতে থাকে, তবে পুরো বিশ্বে অনলাইনে শপিং এক বিরাট বাস্তবতায় রূপ নেবে। আলীবাবাসহ অনলাইন কোম্পানিগুলো এই বাজার দখল করে নেবে। ফলে বড়ো বড়ো শপিংমলগুলো লোকসান তো গুনবেই বরং প্রয়োজনীয়তাও হারাতে পারে। বিশ্ব দেখেছে প্রিন্স চার্লস থেকে দরিদ্র দেশের নাগরিক কেউ পৃথিবীর দুর্যোগ থেকে মুক্ত নয়, সুতরাং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের মতো করোনা পরবর্তী সময়ে একটি মানবিক ও শান্তির পৃথিবীর ডাক আসবে। সে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ কারা নেবে এখনই তা বলা যাচ্ছে না। তবে এটা ঠিক, ভবিষ্যতে বিশ্ব জুড়ে কর্তৃত্বের কাঠামোগত ওলট-পালট ঘটতে চলেছে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়