তাপস কুমার দত্ত
অফিসে যেতে ঢাকায় আমাকে পাবলিক বাসে উঠতেই হয়। আর পাবলিক বাসে যারা নিয়মিত যাতায়াত করেন তাদের কখনো না কখনো হিজড়াদের মুখোমুখি হতেই হয়। হিজড়া, ভালো বাংলায় যাদের বলা হয় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ, অনেকের কাছে আতঙ্কের নাম। আমি নিজেও তৃতীয় লিঙ্গের কাউকে বাসে উঠতে দেখলে ঘুমের ভান করতাম। এই কৌশল শিখিয়ে ছিল আমার এক বন্ধু। আমার সিটের কাছে এসে কাঁধে টোকা দিয়ে কখনো-সখনো বলত—‘এই ছাহরুক! কিছু দে!’ আমি বেঘোরে ঘুমের ভান করতাম। হতাশ হয়ে অন্যদের সঙ্গে টাকা দেওয়া না দেওয়া নিয়ে চিত্কার করে হাতে তালি দিয়ে দেহ দুলিয়ে ওরা নেমে যেত বাস থেকে। কিন্তু একজন মানুষের জন্য তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ পালটে যায়। তার নাম নাদিরা খানম।
তৃতীয় লিঙ্গের অধিকারকর্মী হিসেবে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ‘অনন্যা শীর্ষদশ সম্মাননা ২০১৭’ অর্জন করেন নাদিরা খানম। তার ওপর তথ্যচিত্র নির্মাণের দায়িত্ব পড়ে আমার ওপর। এই অভূতপূর্ব এবং মানবিক নির্বাচনের জন্য আমি নতুন করে বিস্ময় বোধ করি পাক্ষিক অনন্যার সম্পাদক (ইত্তেফাকেরও) এবং অনন্যা শীর্ষদশের শীর্ষব্যক্তি তাসমিমা হোসেন আপার প্রতি। আপার নির্দেশে রংপুর এবং ঠাকুরগাঁওয়ে গিয়ে নাদিরা খানমের ওপর শুটিং করি। এটা ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসের ঘটনা। সেই দুই দিন আমরা পুরো টিম প্রচণ্ড অবাক হই এই ভেবে যে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে সাধারণ মানুষ কতোই না ভুল জানে! সেই বছর ৭ এপ্রিল বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে আর ৯ জনের সঙ্গে নাদিরা খানমকে অনন্যা শীর্ষদশ সম্মাননা জ্ঞাপন করা হয়।
নাদিরা খানমের জীবনটা যেন পুড়ে পুড়ে অঙ্গার হওয়ার মতো! আদমজী জুট মিলসের কর্মকর্তার চার সন্তানের মধ্যে নাদিরা ছিলেন দ্বিতীয়। প্রতিভাবান নাদিরা খানম বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন যখন বাবা-মা তার ছোটো বোনের বিয়ে দিতে পারে না, কারণ পাত্রপক্ষ মনে করেন পাত্রীর বোন নাদিরা হিজড়া হওয়ার কারণে তাদের পরবর্তী বংশের কেউ হিজড়া হতে পারে! নাদিরা বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে তার মাকে বলেন, ‘তোমার তো আরো সন্তান আছে। ধরে নাও মা, তোমার নাদিরা মারা গেছে!’
সেই নাদিরা খানম আর নেই। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে তিনি মারা গেছেন। তিনি মারা গেছেন টাঙ্গাইলে। কীভাবে নাদিরা মারা গেলেন, সেটা একটা রহস্য। আমরা নাদিরা খানমের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। টাঙ্গাইলের আশপাশে আমাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে এই ঘটনার কোনো সূত্র-সন্ধান এখনো খুঁজে পাইনি। নাদিরার হিতাকাঙ্ক্ষী তৃতীয় লিঙ্গের এক প্রতিনিধি কেবল নাদিরা মৃত্যুর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু এটা এখনো কোনো গণমাধ্যমে আসেনি। আমরা মনে করি নাদিরা রহস্যজনক মৃত্যুর সমাধান হওয়া উচিত।
সারা বিশ্বেই কিন্তু তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা স্ব-স্ব প্রতিভা অনুযায়ী সমাজ-রাষ্ট্রে বিশেষ অবদান রাখছেন। নাদিরা চেষ্টা করেছিলেন, দুর্ভাগ্য যে তিনি শেষ পর্যন্ত হেরে গেলেন। বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে হিজড়াদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আর তৃতীয় লিঙ্গের একজন প্রতিনিধি হয়ে দিনাজপুরের মেয়ে নাদিরা খানম রংপুর সিটি করপোরেশনে নির্বাচনে অংশও নিয়েছিলেন। মোবাইল ফোন প্রতীক নিয়ে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে রংপুর সিটি করপোরেশনের ১৮, ২০ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন নাদিরা খানম। তার ইচ্ছে ছিল সংরক্ষিত নারী আসনে তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্য হওয়ার। এজন্য তিনি ছোটাছুটি করেছেন নানান জায়গায়। কিন্তু সফল হননি। তৃতীয় লিঙ্গের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য বাংলাদেশ সরকার নিশ্চয়ই পারত একজন সংসদ সদস্য নির্বাচন করতে, যা বাংলাদেশকে আরো মানবিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত দান করত। মার্জিত শিক্ষিত নাদিরা খানম এক্ষেত্রে যোগ্য ছিলেন নিঃসন্দেহে।
নাদিরা জীবনযুদ্ধে হারতে চান না। অনেক ঘাতপ্রতিঘাত পার করে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তার ওপর তথ্যচিত্র নির্মাণের সময় নাদিরার সঙ্গে থাকা আরো প্রায় ৮/১০ জন হিজড়ার জীবনী শুনতে শুনতে চোখ অশ্রুতে ভিজে উঠেছিল আমাদের। নাদিরার মৃত্যুর কথা জেনে যারপরনাই ব্যথিত হলাম।
n লেখক :সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার
