ব্রিটেনে করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। ইউরোপের এই দেশটিতে পরিস্থিতি আরো ভয়ংকর হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত দেশটির প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন হাসপাতাল ছেড়েছেন। স্পেনে মৃত্যুর সংখ্যা কমার পর আবার বেড়েছে। আর সৌদি আরব ভাইরাসের বিস্তার রোধে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ বাড়িয়েছে। বিশ্বে আক্রান্ত ১৮ লাখ ৩৫ হাজার এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১ লাখ ১৩ হাজার ছাড়িয়েছে। সুস্থ হয়েছে ৪ লাখ সাড়ে ২০ হাজারের বেশি মানুষ।
ভাইরাস ভয়ংকর হতে পারে ব্রিটেনে
ব্রিটেনে ২৪ ঘণ্টায় ৭৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশটিতে মোট মৃত্যু ১০ হাজার ৬১২ জনে দাঁড়িয়েছে। মোট আক্রান্ত হয়েছে ৮৪ হাজার ২৭৯ জন। এরই মধ্যে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ডাউনিং স্ট্রিট সূত্র জানিয়েছে, লন্ডনের সেন্ট টমাস হাসপাতালে গত রবিবার থেকে তিনি চিকিত্সাধীন ছিলেন। তিনি বাকিংহামশায়ারে তার সরকারি শহরতলির বাসভবনে গেছেন। তিনি সহসা কাজে ফিরতে পারবেন না। কবে তিনি কাজে ফিরতে পারবেন তা স্পষ্ট নয়।
হাসপাতাল ছাড়ার পর ডাউনিং স্ট্রিটে পৌঁছে বরিস জনসন টুইটারে ৫ মিনিটের একটি ভিডিও পোস্টে বলেন, বেঁচে থাকা কিম্বা মরে যাওয়া যে কোনো কিছুই হতে পারতো। তিনি বলেছেন, হাসপাতালের ফ্রন্ট লাইনে হাসপাতালের কর্মীরা কতোটা সাহসের সঙ্গে কাজ করছেন সেটা তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের চিকিত্সক ও নার্সরাই জীবন বাঁচিয়েছে উল্লেখ করে তিনি নার্স বিশেষ করে নিউ জিল্যান্ডের জেনি এবং পর্তুগালের লু্ইসকে ধন্যবাদ জানান। তারা দুইজন ৪৮ ঘন্টাই তার শয্যার কাছে উপস্থিত থাকতেন।
যুক্তরাজ্যে সরকারের শীর্ষস্থানীয় বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা সার জেরেমি ফারার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ইউরোপের যে সব দেশে কোভিড-১৯ মারাত্মক ও খারাপভাবে ছড়িয়েছে তার মধ্যে যুক্তরাজ্যের নাম যুক্ত হতে পারে। এদিকে ব্রিটেনে করোনা ভাইরাসে সংখ্যালঘু এশীয়, আফ্রিকান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষ যে অতিরিক্ত সংখ্যায় সংক্রমিত হচ্ছে সেই সম্পর্কে নতুন তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে বিকল্প মিডিয়া উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের কারামুক্তি চেয়েছেন তার জীবনসঙ্গী স্টেলা মরিস। লন্ডনের বেলমার্শ কারাগারে অ্যাসাঞ্জ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন, এমন আশঙ্কা জানিয়ে তার জামিনের জন্য আবেদন করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রে লকডাউন শিথিলের চিন্তা
ওয়ার্ল্ডো মিটার সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে করোনা ভাইরাসে মৃত্যু বেড়েই চলছে। ২৪ ঘন্টায় দেশটিতে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৬৪৯ জনে এবং আক্রান্ত হয়েছে সাড়ে ৫ লাখের বেশি মানুষ। আমেরিকায় সংক্রামক ব্যাধি বিষয়ক প্রধান ড: অ্যান্তোনিও ফসি বলেছেন, সম্ভবত আগামী মাসে অন্তত কোনো না কোনোভাবে দেশের কোনো কোনো অংশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। তবে তিনি বলেছেন, এই প্রক্রিয়া পর্যায়ক্রমে করতে হবে। এটা সারা দেশে ‘লাইট সুইচ’ একসঙ্গে আবার জ্বালিয়ে দেওয়ার ব্যাপার নয়। সেটা হলে ফল উল্টো হতে পারে।
ড. ফসি বলেছেন, দেশের এক একটা অংশে ক্রমান্বয়ে লকডাউন তুলে নেবার প্রক্রিয়া শুরু করলে আক্রান্তদের শনাক্ত করে তাদের আইসোলেট করার সময় পাওয়া যাবে। তবে এই প্রক্রিয়া কখন শুরু হতে পারে তা অনুমান করা কঠিন। যদিও আগামী মাসে প্রথম ধাপ শুরু করার কথা ভাবা হচ্ছে বলে তিনি জানান। দেশের মধ্যাঞ্চলে এবং উত্তর পশ্চিমে যেখানে ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে কম বা সংক্রমণ কমে এসেছে, সেখান থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে বলে তিনি জানান।
মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা এবং মার্কিন ধনকুবের বিল গেটস বলেছেন, বিশ্বকে করোনাভাইরাসের মহামারির আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হলে এই ভাইরাসের টিকা আবিস্কারের কোন বিকল্প নেই। বিল গেটস ২০১৫ সালেই এরকম একটি ভয়ংকর বিশ্ব মহামারির বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছিলেন।
স্পেনে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সিদ্ধান্তে উদ্বেগ
স্পেনে মৃত্যুর সংখ্যা আবার বেড়েছে। এর মধ্যে সোমবার থেকে কিছু কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার সরকারি পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল ৬১৯ জনের মৃত্যুর খবর আসার আগে যে আক্রান্তের হার নিম্নমুখী হচ্ছিল সে চিত্র কিছুটা বদলে গিয়েছে। দেশটিতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ হাজারে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেস বলেছেন, অপরিহার্য নয় এমন কর্মীরা সোমবার থেকে কাজে ফিরতে পারেন। এদের মধ্যে যারা গণপরিবহন ব্যবহার করবে তাদের ফেসমাস্ক দেওয়া হয়েছে।
সৌদিতে অনির্দিষ্টকালের কারফিউ
সৌদি আরব করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সারা দেশে কারফিউয়ের মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দিয়েছে। গত সপ্তাহে সৌদি আরবের অধিকাংশ প্রধান শহরে পুরো ২৪ ঘণ্টার লকডাউন জারি করা হয়। অন্য শহরগুলোতে দুপুর থেকে ভোর পর্যন্ত কারফিউ জারি আছে। যারা আইন ভাঙার চেষ্টা করেছে শনিবার থেকে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করতে শুরু করেছে। সৌদি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেখানে ৪ হাজারের বেশি মানুষের ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছে ৫২ জন।
অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি
ইতালিতে তিন সপ্তাহের মধ্যে গতকাল সবচেয়ে কম মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২৪ ঘন্টায় মৃত্যু হয়েছে ৪৩১ জনের। গত ১৯ মার্চের পর এটাই সবচেয়ে কম সংখ্যক মৃত্যু। এর আগের দিনও মৃত্যু ছিল ৬১৯ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন উপেক্ষা করে করোনাভাইরাসে মৃতদের পোড়ানোর (শবদাহ) জন্য সরকারি নির্দেশনা জারি করেছে শ্রীলংকা। পরিবেশগত ঝুঁকির অজুহাতে নতুন এই নির্দেশনার গেজেট শনিবার প্রকাশ হয়েছে। এর ফলে দেশটির সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
কানাডায়ও মৃত্যুর সংখ্যা এক দিনে ১২ ভাগ বেড়েছে। ২৪ ঘন্টায় ৭৪ জনের মৃত্যুতে দেশটিতে মোট মারা গেছে ৬৭৪ জন এবং আক্রান্ত হয়েছে ২৩ হাজার ৭১৯ জন। এক বাসায়ই ৩১ জনের করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হওয়ার তদন্ত শুরু হয়েছে।
মস্কোয় কোয়ারেন্টাইন ভঙ্গকারীদের ক্যামেরার মাধ্যমে ধরা হচ্ছে। কর্মকর্তারা বলছেন, করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়া ৩০জন ঘরে কোয়ারেন্টাইনে থাকার কঠোর নিয়ম ভঙ্গ করার কারণে তাদের ধরা হয়েছে। এছাড়াও শহরের সাড়ে ১৩ শ’র বেশি বাসিন্দা কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া শনিবার রাস্তায় বেরনোর কারণে তাদের জরিমানা করা হয়েছে।
ভারতে ২৪ ঘণ্টায় আরো ৯১৮ জন সংক্রমিত হয়েছে। ফলে দেশটিতে করোনা আক্রান্ত ৮ হাজার ৪৪৭ জন। ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে আরো ৩৪ জনের। সারা দেশে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭৩ জনে। করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইতে সারা দেশে যখন লকডাউন চলছে, তখন গতকাল বিকেলে রাজধানী দিল্লি ও তার আশেপাশের এলাকা মাঝারি মাপের ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা পৌনে ৬ টা নাগাদ বাড়ি-ঘর কেঁপে ওঠে। ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে ঐ ভূমিকম্পের তীব্রতা ছিল ৩ দশমিক ৫।
বিশ্বে লকডাউনের মধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইত্তেহাদ এয়ারওয়েজ ইউরোপ ও জাপানে বিশেষ কিছু ফ্লাইট চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। ইরানেও ২৪ ঘণ্টায় মৃতের সংখ্যা ১১৭ জন বেড়ে ৪ হাজার ৪৭৪ জনে দাঁড়িয়েছে। মালয়েশিয়ায় নতুন করে ১৫৩ জন এবং ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাকিস্তানে ৫ হাজার ১৭১ জন আক্রান্ত এবং ৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। —বিবিসি, আলজাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ান
