নববর্ষ

বর্ষপঞ্জির প্রয়োজন কেন?

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২০, ১৯:৫৭

 

আমাদের নাগরিক জীবনের এক অপরিহার্য অঙ্গ হলো বর্ষপঞ্জি অর্থাত্ ইংরেজিতে যাকে বলে ক্যালেন্ডার। সাধারণভাবে বলা যায় বর্ষপঞ্জি বা ক্যালেন্ডার হলো মাস, সপ্তাহ ও বারে বিভক্ত একটি বত্সরভিত্তিক সারণি; অন্যদিকে পঞ্জিকা হলো নাগরিকের প্রয়োজনে ও সুবিধার্থে পালা-পার্বণ, ধর্মীয় উত্সবের দিন, ক্ষণ, তিথি, নক্ষত্র, মাস ইত্যাদি খচিত একটি বত্সরভিত্তিক অনুপুঙ্খ বিবরণ। একটি সন্তোষজনক সর্বজনগ্রাহ্য পঞ্জিকা তৈরির সমস্যা সভ্যতার উষালগ্ন থেকেই শুরু হয়েছে, যার সর্বোত্কৃষ্ট সমাধান আজো মেলেনি। আর এ প্রচেষ্টা থেকেই পর্যবেক্ষণভিত্তিক বিজ্ঞানচর্চা, বিশেষ করে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার শুরু। যে কোনো বর্ষপঞ্জি প্রণয়নের মূল ভিত্তি হলো জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যবেক্ষণলব্ধ উপাত্ত থেকে বত্সর, মাস ও দিনের ‘কাল-একক’ (unit of time) নির্ধারণ। আর এ কাজে ব্যবহূত ‘কালমাপক’সমূহ হলো:

আবর্তনশীল জ্যোতিষ্কসমূহ—যাদের নিজ অক্ষের উপর ঘূর্ণন ক্রমান্বয়ে দিন ও রাত্রি সৃষ্টি করে; সবচাইতে ব্যবহূত জ্যোতিষ্কদের মধ্যে রয়েছে:

১.             চন্দ্র: আকাশে চন্দ্রের গতির কারণে প্রতিভাত হয় ‘চন্দ্র-দশা’ (Phase of the moon) এবং যা থেকে আমরা ধারণা করি মাসের।

২.             সূর্য: আকাশমণ্ডলে সূর্যের আপাত বার্ষিক গতি সৃষ্টি করে ঋতুমণ্ডলী এবং আমরা পাই বত্সরের হিসাব।

আমরা অবশ্য এখন জানি যে, পৃথিবীর আহ্নিক গতির কারণে আকাশের তারকারাজি ও অন্যান্য জ্যোতিষ্ক প্রতিদিন একবার করে আবর্তিত হয়, এবং অন্যদিকে ক্রান্তিবৃত্তে সূর্যের আপাত গতি বস্তুত পৃথিবীর বার্ষিক গতির ফল। সুতরাং উল্লিখিত প্রাকৃতিক কালচক্রের সূক্ষ্ম সংজ্ঞা ও এদের আবর্তনকাল সূক্ষ্মভাবে নির্ধারণের জন্য পুরাকালে গবেষকদের বছরের পর বছর ধরে খালি চোখে এবং অতি ধৈর্যের সাথে সূর্য, চন্দ্র ও অন্যান্য জ্যোতিষ্কের গতি ও অবস্থান, উদয় ও অস্ত পর্যবেক্ষণ করতে হয়েছে, এদের বৈশিষ্ট্য লক্ষ করতে হয়েছে। আর এভাবেই জ্যোতির্বিদ্যা, বিজ্ঞানের প্রাচীনতম শাখাটি গড়ে উঠেছে।

সৌরদিবস হলো আমাদের নাগরিকজীবনের বৈধ কাল একক—পৃথিবীর নিজ অক্ষের ঘূর্ণন-কালকেই ধরা হয় এক সৌরদিবস। এ দিবসকে ‘সাবন দিবস’ বা সিভিল দিবস নামে অভিহিত করা হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবে এবং গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারের গণনায় সূর্যের মধ্যরাত্রির অবস্থান থেকে পরবর্তী মধ্যরাত্রির অবস্থানে প্রত্যাবর্তনের সময়ের ব্যবধানকে ধরা হয় এক অহোরাত্র বা পূর্ণদিবস। সূক্ষ্ম পরিমাপ থেকে দেখা গেছে যে ঋতু-পরিবর্তনের সাথে, অর্থাত্ পৃথিবীর পরিক্রমণ পথে সূর্যের সাপেক্ষে পৃথিবীর অবস্থানের সঙ্গে সৌরদিবসের দৈর্ঘ্যে তারতম্য ঘটে; তাই দীর্ঘদিন ও দীর্ঘসময় ধরে পর্যবেক্ষণলব্ধ উপাত্তের গড় পরিমাপকেই ধরা হয় ‘গড় সৌরদিবস’—যা সময়ের আইনানুগ মৌলিক একক হিসেবে গৃহীত। এই গড় সৌরদিবসের ১/৮৬,৪০০০তম ভগ্নাংশকে গণ্য করা হয় ১ সেকেন্ড। জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিভিন্ন প্রকৃতির বত্সর হিসাব করা হয় নানা প্রয়োজনে, এবং এদের দৈর্ঘ্যও ভিন্ন। তবে বর্ষপঞ্জির জন্য ক্রান্তি বত্সর অর্থাত্ ঋতুসমূহের বত্সর (year of the seasons) ব্যবহারই বিধেয়।

 

বঙ্গাব্দ

সাধারণভাবে বলা হয় যে, দিল্লিতে সম্রাট আকবর কর্তৃক ‘তারিখ ই-ইলাহি’ প্রবর্তিত হলে বঙ্গদেশে এই সূত্র ধরে সূর্যসিদ্ধান্তভিত্তিক সৌরবত্সর ব্যবহার শুরু হয়। কাজেই বলা যেতে পারে বাংলা সন হলো একটি সঙ্কর অব্দ যার মূল ভিত্তি ছিল হিজরি সন, কিন্তু গণনা করা হতো সৌরবত্সর ধরে।

মনে করা হয় বাংলা সন চালু হয় ৯৬৩ হিজরিতে, অর্থাত্ ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে। তাই ৯৬৩-কে বাংলা সন করা হয়, তবে এটিকে সৌরবত্সর হিসেবে গণনা করা হয়। সুতরাং কোনো খ্রিষ্টীয় অব্দ থেকে বাংলা সন পেতে হলে আমরা নিচের সূত্রটি ব্যবহার করতে পারি:

ধরা যাক, x নির্ণেয় বাংলা সন; y প্রদত্ত খ্রিষ্টীয় সন

তাহলে আমরা লিখতে পারি: x = ৯৬৩+ (y —১৫৫৬)

উদাহরণ ধরা যাক y = ২০০০, তাহলে

x = প্রাতিষঙ্গিক বাংলা সন = ৯৬৩+(২০০০—১৫৫৬)

                                  = ৯৬৩+৪৪৪

                                  = ১৪০৭ বাংলা সন  (অংশবিশেষ)

সূত্র: বাংলাদেশের উত্সব নববর্ষ/সম্পাদক: মোবারক হোসেন

(বাংলা একাডেমি, ২০০৮)