রাত পোহালেই আগামীকাল ভোট। প্রচারণার সময় ছিল ১৮ দিনের। ১০ ডিসেম্বর থেকে ভোট চাইতে নামে রাজনৈতিক দলগুলো। তবে প্রচারণার শেষ দিনেও ভোটের মাঠ অসমই ছিল। শেষ দিনেও দাঁড়াতে পারেনি সরকার বিরোধী জোটের নেতাকর্মীরা। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, পুলিশ এবং সরকার দলীয় সংগঠনের বিরুদ্ধে নালিশ করা ছাড়া যেন আর কিছুই করার ছিল না বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের। তাতে স্রোতের পরিবর্তন ঘটেনি। বরং সময় গড়িয়ে মাঠের পুরো দখল রয়েছে সরকারি দলের। এই অবস্থায় গতকাল বিবৃতি এবং সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট একং ২০ দলীয় জোট ধানের শীষের সমর্থক ও সকল ভোটারদের ভয়-ভীতি-বাধা উপেক্ষা করে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রদানের মাধ্যমে ‘দেশের মালিকানার বুঝে নিতে রায়’ দেওয়ার আহবান জানিয়েছেন।
ভোট বিপ্লবে অংশ নেয়ার ডাক ড. কামালের: জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন এক লিখিত বক্তব্যে বলেন, প্রিয় দেশবাসী ও ভোটাদের প্রতি আবারও আমার আকুল আবেদন,সাহস করে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট বিপ্লবে অংশ নিন। ৩০ ডিসেম্বর ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দ্বিধাহীন চিত্তে আপনার মূল্যবান ভোট প্রয়োগ করে দেশের স্বাধীনতা এবং আপনাদের মালিকানা নিশ্চিত করবেন। দেশবাসীর প্রতি এটাই আমার প্রত্যাশা।
ড. কামাল হোসেনের পক্ষে ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক কমিটির আহ্বায়ক জগলুল হায়দায় আফ্রিক পল্টন টাওয়ারের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই বক্তব্য তুলে ধরেন। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে ঐক্যফ্রন্টের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী, নেতা-কর্মী-সমর্থকদের মাঠে দাঁড়াতে দেওয়া হচ্ছে না। ঐক্যফ্রন্টকে প্রচারণায় নানাভাবে বাধা দেওয়া ও গণগ্রেফতারের বিষয়টি আজ সবার জানা। তার পরও ভোটাররা কিন্তু থেমে নেই। তারা নিজের মতো করে প্রস্তুতি নিয়ে যার যার এলাকায় ফিরে গেছেন ১০ বছর পর তাদের কাঙ্ক্ষিত ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য। পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য। তারা মূলত ভোট উত্সবের অপেক্ষায়। তাই যতই বাধা দেওয়া হোক না কেন, এই ভোটারদের কেউ দমিয়ে রাখতে পারবে না। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ৩০ ডিসেম্বর ভোটারদের নিরাপদে ভোট দেওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করে দেবে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তাদের কাছে সে প্রত্যাশাই করছে।
কেন্দ্র পাহারা দেওয়ার আহবান বিএনপির:বিএনপির পক্ষ থেকে ‘দেশের মুক্তিকামী জনতা, ধানের শীষের সমর্থক ও সকল ভোটারদের প্রতি আহবান’ শীর্ষক এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুঃশাসনের শেকলে বন্দী বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে চলেছে। সকল হুমকি-ধামকি, ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে দলে-দলে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার দিন ৩০শে ডিসেম্বর। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিজেদের সামর্থ্যে আস্থা রেখে ধানের শীষে ভোট দিন। আপনাদের একেকটি ভোটই নিশ্চিত করতে পারে নিরাপদ ও শান্তির বাংলাদেশ। মুক্ত করতে পারে কারাবন্দী বেগম খালেদা জিয়াকে। ভোট দিয়ে ভোট কেন্দ্র ত্যাগ করবেন না। ভোটের ফল বুঝে নিয়ে বিজয়ের বেশে তবেই ঘরে ফিরবেন। ফলাফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রে অবস্থান করুন। পাহারা দিন।
দলের পক্ষে এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহবান জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, আপনারা দেশের সন্তান। অন্তত একটা দিন দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ নিদর্শন প্রদর্শন করুন। দেশের প্রতিও আপনাদের দায়িত্ব আছে। এতদিন সরকারের চাপে যা করেছেন এখন সময় এসেছে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের। দেশের কল্যাণের কথা চিন্তা করে, দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট আয়োজনে সহযোগিতা করুন।
এদিকে গতকাল শুক্রবার রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ২০ দলের সমন্বয়ক, বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, এখনও বিএনপি নেতা-কর্মীদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক বৈধ হওয়া ১৬ জন প্রার্থীকে আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছেন। এমন সময়ে অবৈধ ঘোষণা করা হলো যে এখন আর নতুন করে প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি দাবি করেন, নির্বাচন কমিশন কৌশলে এই ১৬টি আসন সরকারি দল আওয়ামী লীগকে উপহার দিল। তিনি বলেন, এরপরও আমরা চাইব শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু একটি নির্বাচনের পরিবেশ বজায় রাখা হোক। যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, শওকত মাহমুদ, যুগ্ম-মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল প্রমুখ।
এদিকে গতকাল নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ইতিমধ্যে জনগণ ভয়কে জয় করে জেগে উঠছে, হামলা নির্যাতনকে রুখে দিচ্ছে, বিভিন্ন জায়গায় প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে। বিজয়ের ক্ষণ গণনা চলছে। বিজয় আমাদের সন্নিকটে।
৮ প্রার্থীকে বিএনপির সমর্থন:ভোট গ্রহণের আগের দিন গতকাল একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ৩ জন স্বতন্ত্র ও অন্য ৫ টি আসনে বিকল্প প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে ঢাকা-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমা ইসলাম, জয়পুরহাট-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আলেয়া বেগম ও বগুড়া-৭ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম বাবুলকে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। এছাড়া সিলেট-৫ আসনে গণফোরামের মুকাব্বির খান, মানিকগঞ্জ-৩ আসনে গণফোরামের মফিজুল ইসলাম খান কামাল এবং চাঁদপুর-৪ আসনে লায়ন হারুন অর রশীদকে ধানের শীষ প্রতীক দেওয়া হয়েছে। নীলফামারী-৪ আসনে দলের বিকল্প প্রার্থী কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীনকে ধানের শীষ প্রতীক দেওয়া হয়েছে। জামালপুর-১ আসনে গণফোরামের ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল হককে সমর্থন দিয়েছে দলটি।
