‘রোদন-ভরা এ বসন্ত/ কখনো আসেনি বুঝি আগে।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কথা লিখিয়াছেন শতাধিক বর্ষ পূর্বে। আজি, এই ১৪২৭ বঙ্গাঙ্গের প্রথম দিনে, যেই অভাবিত দুর্যোগের মুখোমুখি হইয়াছি আমরা, তাহা ঐ কান্নাসিক্ত বসন্তের মতোই। এমনটি বুঝি আগে কখনো আসে নাই! পৃথিবীতে যুগ যুগ ধরিয়া মহামারি আসিয়াছে বটে, কিন্তু সেই মহামারির হাত ধরিয়া মানবজাতি সম্ভাব্য কোন কোন মহাবিপদের মহাগর্ভে পতিত হইতে যাইতেছে, তাহা জানা থাকিত না। এখন তাহা অনুধাবন করা যাইতেছে। আর তাহা উপলব্ধি করিয়া সমগ্র মানবজাতি দম বন্ধ করা আতঙ্কে দিনাতিপাত করিতেছে। মানবজাতি এখন জ্ঞানে গরিমায়, শক্তিতে বিজ্ঞানে বহু যোজন পথ পাড়ি দিয়াছে, কিন্তু কোভিড-১৯-এর নিকট নতজানু দাসের ন্যায় আত্মসমর্পণ করিতেছে। তাবত্ বিশ্বের সূচিভেদ্য সীমানা খোলামকুচির মতো ভাঙিয়া দাবানলের ন্যায় ধাবিত হইতেছে এই মারণভাইরাস। অথচ করোনা যখন কেবল চীনের অভ্যন্তরে সুনামি সৃষ্টি করিয়াছিল, তখন সারা বিশ্ব ভাবিয়াছিল উহা চীনের একার সমস্যা। সার্স, মার্স, ইবোলার মতো উহা ছোটো একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকিবে। এই জন্য গত ২৫ জানুয়ারি চীন যখন তাহার নববর্ষের সকল আয়োজন বাতিল করিতে বাধ্য হয়, তখন সারা বিশ্ব ভাবিতেছিল, আহা! কী অভাগা জাতি! চীনের জিডিপির কত শতাংশ গ্রাস করিবে করোনা ভাইরাস—তাহার হিসাব করিতেছিল বিশ্ব অর্থনীতির বিশ্লেষকেরা। আর দূরে বসিয়া প্রকৃতির মহাশক্তি যেন মুচকি হাসিতেছিল।
আজ, ১৪ এপ্রিল, বাঙালির প্রাণের উত্সব নববর্ষের সকল আয়োজন আমরাও বাতিল করিতে বাধ্য হইয়াছি। অথচ, কতই-না হূদয় উদ্ভাসিত করা বাংলার অপূর্ব মাটিগন্ধমাখা এই প্রাণের পহেলা বৈশাখ! বাংলা নববর্ষ এমন একটি সময় শুরু হয়, যখন বসন্তের দহনকাল শেষে গ্রীষ্মের বিচিত্র রসাল ফলসম্ভারে ভরিয়া উঠে প্রকৃতি। নূতন বত্সরের শুভারম্ভে ফলদ বৃক্ষরাজির মুকুলগুলি সবুজ কাঁচা হইতে ক্রমশ পরিপূর্ণ হইয়া উঠিতে আরম্ভ করে। পহেলা বৈশাখ যেন সেই সবুজ আর কাঁচাদের সম্ভাষণ জ্ঞাপনের দিন! নববর্ষের চিরাচরিত উত্সবের কিছুই এইবার আয়োজন করা সম্ভব হইবে না। হালখাতা, বৈশাখী মেলা, মধুমাসের মেলা ও আঞ্চলিক উত্সব—কত কী প্রাণের মেলা! এই আয়োজন, এই উত্সব জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সকলের। যদিও বাংলা নববর্ষ সৃষ্টি হইয়াছিল ফসলি সন ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে। সম্রাট আকবর সেই সময়ের প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদদের তত্ত্বাবধানে চান্দ্র ও সৌরবর্ষের সংমিশ্রণে প্রচলন করেন ‘তারিখ ইলাহি’ নামে নূতন এক অব্দের। সেই অব্দই পরবর্তীকালে চালু হয় ‘বঙ্গাব্দ’ রূপে। সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রবর্তন করেন এই সন। এত বত্সরের এই সন এখন মিশিয়া গিয়াছে বাঙালির জাতিসত্তায়। এই কারণে পহেলা বৈশাখ আমাদের ভিতরে পরমতসহিষ্ণুতা, সদ্ভাব, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মনুষ্যত্বের দীক্ষা দেয়। আমাদের অন্তরকে বিকশিত করে, নিজের মাটিকে চিনায়, শেকড়কে চিনায়। ইহা এই বার্তা দেয় যে, আমরা আলাদা কেহ নহি। করোনার এই কালবেলায় বাংলা নববর্ষ আমাদের এই শক্তি দিতেছে, দুর্যোগ মোকাবিলা করিতে হইবে সম্মিলিত শক্তি দিয়া। আমরা জানি না, করোনা আমাদের কোথায় লইয়া যাইবে। এই জন্য সময় এখন সৌহার্দের, ভ্রাতৃত্বের। সকলের শুভ হউক। শুভ নববর্ষ।
