জাহিদুল ইসলাম
বর্তমানে মহামারির কারণে আমরা যে বিশ্ব দেখছি তা মহামারিপূর্ব সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল। এ রাজনৈতিক ব্যবস্থার নির্মাণ শুরু হয় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিবর্তনের মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কমিউনিজমের প্রতিরোধ এবং পরবর্তীকালে ইসলামি সন্ত্রাসবাদের নির্মূলের বিপরীতে উদার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়। পরস্পরের মধ্যে অবাধ বাণিজ্যিক সম্পর্কের ফলে বিশ্বায়নের বিস্তার লাভ করে। এ বিশ্বায়ন বৈশ্বিক রাজনৈতিক স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করে দেয়? সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে জন লক ও অ্যাডাম স্মিথের মতো অর্থনীতিবিদগণ ক্লাসিক্যাল উদারতাবাদের ধারণা প্রবর্তন করেন। অধ্যাপক মিল্টন ফ্রিডম্যান নব্য উদারতাবাদ ধারণার প্রবর্তক হিসেবে অভিহিত করা হয়। নব্য উদারতাবাদের ধারণার প্রয়োগ শুরু হয় ১৯৮০-র দশক থেকে।
আশির দশকে রোনাল্ড রিগ্যান এবং মার্গারেট থ্যাচার নব্য উদারতাবাদের নীতি গ্রহণ করেন। নব্য উদারতাবাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে কোনো রাজনৈতিক বা সরকারি হস্তক্ষেপ থাকবে না। অর্থাত্ এর মাধ্যমে করপোরেটতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করা হয়।
নির্ভরশীল তত্ত্বের অন্যতম তাত্ত্বিক সামির আমিনের মতে, নব্য উদারতাবাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে পাঁচ ধরনের উপাদানের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এগুলো হচ্ছে আধুনিক যন্ত্রপাতির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, খনিজসম্পদের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, সামরিক অস্ত্রের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। তাই রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এ বিশ্বায়নের সঙ্গে আধিপত্য ও কর্তৃত্বের সম্পর্ক বিশেষভাবে জড়িত। এর পাশাপাশি এটি ভয়ংকরভাবে প্রকৃতির প্রতিও নির্দয়। শিল্পকারখানার উন্নয়নের নামে কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ করা হয় জীবাশ্ম জ্বালানিতে। জীবাশ্ম জ্বালানির ফলে পরিবেশের যে বিপর্যয় ঘটছে এটি স্বীকার করতে নারাজ সর্বোচ্চ পরিবেশ দূষণকারী দেশের নেতারা। কারণ ট্রাম্প বা বলসোনারোর মতো নেতারা ব্যবসাবান্ধব হলেও পরিবেশবান্ধব নয়।
বিশ্বায়নের নামের নতুন এ বিশ্বব্যবস্থা যে নিরাপত্তার ওপর জোর দেয় তা ছিল পুরোপুরি আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার। বৈশ্বিক মহামারিও যে মানুষের নিরাপত্তার হুমকি হতে পারে—এ ব্যাপারে সবাই ছিলেন উদাসীন ও নির্লিপ্ত। এ জন্য স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়নও ব্যয় বৃদ্ধির চেয়ে তুলনামূলক তথাকথিত নিরাপত্তা খাতে ব্যয়ের ব্যাপারে সবাই আগ্রহী ছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে মহামারি নিয়ে গবেষণাকারী জীববিজ্ঞানী রব ওয়ালেসের এক সাক্ষাত্কার জার্মান ম্যাগাজিন মার্ক্স ২১ তে প্রকাশিত হয়। রব ওয়ালেসের মতে বর্তমান সময়ের বিভিন্ন ভাইরাস ক্রমশ ভয়ংকর হয়ে উঠছে। এর পিছনে তিনি নব্য উদারতাবাদ এবং এর ফলে সৃষ্ট পরিবেশের ভারসাম্যহীনতাকেই দায়ী করেছেন। গণতান্ত্রিক উদারনৈতিক রাষ্ট্রগুলো স্বাস্থ্য কাঠামোর উন্নয়নের ব্যাপারে দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে চলমান মহামারি। ইউরোপ আমেরিকার দেশগুলোর চিকিত্সকরা তাদের ক্রোধ প্রকাশ করে নিজ দেশের চিকিত্সা ব্যবস্থার ওপর। যদিও করোনা মহামারিপূর্ব সময়ে তাদের চিকিত্সা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী বলে মনে করা হতো। এ ধারণাটি বর্তমানে একটি উপখ্যানে পরিণত হয়েছে।
ঔপনিবেশিক শাসকরা বুঝানোর চেষ্টা করতেন আমরা তোমাদের কল্যাণের জন্যে কাজ করছি। এ সবই তোমাদের জন্য। এর মধ্য দিয়ে শাসকরা তাদের আধিপত্য বিস্তারের সম্মতি উত্পাদন করতেন। একই আচরণ বিভিন্ন রাষ্ট্রের শাসকরা তাদের জনগণের সঙ্গে দীর্ঘদিন যাবত্ করে আসছেন। পারমাণবিক বোমা তৈরি, অস্ত্র ব্যবসার ইত্যাদির কার্যাবলিকে শাসকরা জনগণের কল্যাণ এবং নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে উপস্থান করেন। এটির ঔপনিবেশিক আধিপত্য বিস্তারেরে সম্মতি উত্পাদন।
বিশ্বময় পরবর্তী চলমান মহামারি হচ্ছে সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট। এ সংকট মোকাবিলায় সারা বিশ্বের প্রস্তুতহীনের কারণ হচ্ছে মানব জ্ঞান কর্তৃক নির্মিত কতগুলো মিথ্যা উপাখ্যান। এ উপখ্যানগুলো আদতে সত্য মনে হলেও এর প্রদীপের নিচে ছিল অন্ধকার। করোনা ভাইরাস পরবর্তী সময়ে সারা বিশ্বে একই অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে।
এ ভাইরাসের ফলে কিছু আশার বাণী হচ্ছে পরিবেশের উন্নতি ঘটছে। বৈশ্বিক বিপর্যয়ের ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। করোনা পরবর্তী সময়ে মহামারির শিক্ষা থেকে যে ভয়াবহ বিশ্বব্যবস্থা রয়েছে তার পরিবর্তন ঘটানো আবশ্যক। সিদ্ধান্ত নিতে কেমন বিশ্ব মানুষ চায়।
n লেখক :শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান
ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
