মোমতাহিনা জান্নাত মায়া
‘মরিতে চাহি না আমি এ সুন্দর ভুবনে’—কবিগুরুর মতো প্রায় প্রতিটি মানুষের মধ্যে এ সুন্দর ভুবনে বেঁচে থাকার ইচ্ছা বিদ্ধমান। তবুও কেউ যদি বাঁচতে না চায়, তবে তা একান্তই তার ইচ্ছা। সাধারণ জনসমাজ তাকে দায়ী করতে পারে না। কিন্তু কেউ যদি বলে, আমি মরব, সঙ্গে তোমাদের সবাইকেও মেরে ফেলব, তখনই সমস্যা সৃষ্টি হয়। ব্যাপারটা অদ্ভুত হলেও বর্তমান সমাজে এমন অদ্ভুত পরিস্থিতিই তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে মহামারিতে রূপ নিতে যাওয়া করোনাকে ঘিরে দেখা দিচ্ছে অনেক মৃত্যুপ্রত্যাশী জনতার। তারা নিজেদের জীবনের তোয়াক্কা তো করছেই না, সঙ্গে অন্যদের জীবনকেও যে নীরবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তা বুঝেও যেন বুঝতে চেষ্টা করছে না।
করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে চিকিত্সক ও বিজ্ঞানীরা জনসমাবেশ এড়িয়ে চলতে, ঘনঘন সাবান-পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে, মুখোশ ব্যবহার করতে, নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া বের না হতে ইত্যাদি নিয়মে মেনে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন। করোনার কোনো চিকিত্সা কিংবা টিকা এখনো আবিষ্কার হয়নি এবং এটি একটি সংক্রামক ব্যাধি জেনেও আমরা করোনা প্রতিরোধের কোনো নিয়ম মানছি না। আমরা নিজেরা করোনায় আক্রান্ত হই কিংবা মারা যাই, তা নিয়ে ভাবছি না। তার কারণ হতে পারে আমরা নিজেদের জীবন নিয়ে উদাসীন কিংবা অসচেতন। কিন্তু সমস্যা হলো এতে কেউ আক্রান্ত হলে, কেবল তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য এ সংক্রামক ব্যাধিটি আরো বিপজ্জনক। তাছাড়া রোগ নির্ণয়ের কিটের স্বল্পতা তো আছেই। কাজেই এই ভয়াবহতা এড়ানোর জন্য যদি আমাদের মধ্যে করোনার লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে নিজ দায়িত্বে পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে এবং পরীক্ষা করে নিতে হবে। কঠোরভাবে কোয়ারেন্টাইনের নিয়মগুলো মানতে হবে।
করোনা এমন একটি সংক্রামক ব্যাধি, যা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে খুব সহজেই একজন থেকে শত শত মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে। এখন, আমার মধ্যে যদি এই ভাইরাসটি থাকে, তাহলে আমার আশপাশের মানুষগুলোর মধ্যেও খুব সহজে ছড়িয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে আমার মৃত্যুর ঝুঁকিতো আছেই, সঙ্গে আমার আশপাশের মানুষগুলোও মৃত্যুর দিকে ঝুঁকে পরবে। নির্মম সত্য কথাটি হলো, তারা আমার কারণেই করোনায় আক্রান্ত হবে এবং আমার কারণেই মারা যাবে। তাই আমার নিয়ম না মানা, আমার করোনায় আক্রান্ত হওয়া কিংবা আমার মারা যাওয়াতে যদিও আমার কিংবা সমাজের কিছু যায় আসে না; কিন্তু আমার কারণে শত শত মানুষের মৃত্যুকে এড়ানো যায় না। বরং তখন আমিই হব শত মানুষের নীরব খুনি। যে খুনের দায় আমার পক্ষে এড়ানো সম্ভব না।
তাই করোনা প্রতিরোধের নিয়মগুলো আমাদের মানতে হবে শুধু নিজের জীবন বাঁচাতে নয়। বরং অন্যদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার দায় এড়ানোর জন্য হলেও নিয়মগুলো মানতে হবে। নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে আরো একবার, ‘আমি মরব বলে, সবাইকে মেরে ফেলব?’
n লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
