দেশের ১৩টি কেন্দ্রীয় কারাগারে ও ৫৫টি জেলা কারাগারের বেশির ভাগেই ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দী অবস্থান করছে। বছরের বেশির ভাগ সময়ে দ্বিগুণসংখ্যক বন্দী অবস্থান করলেও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুলিশের বিশেষ অভিযানের কারণে বন্দীর সংখ্যা বাড়ছে।
কারা অধিদফতরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, গত মে মাস থেকে সারাদেশে মাদক উদ্ধারে সারাদেশে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হবার পর থেকে কারাগারে বন্দীর সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে। বর্তমানে কারাগারে বন্দীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাদক সংক্রান্ত মামলার আসামি বন্দী রয়েছেন। নির্বাচনে তফসিল ঘোষণার পর বন্দীর সংখ্যা বেড়েছে কিনা জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, এ সংক্রান্ত বন্দীর সংখ্যা সারাদেশে মাত্র ৫ হাজার বেড়েছে।
কারা অধিদফতর সূত্র জানায়, দেশের ১৩টি কেন্দ্রীয় ও ৫৫ জেলা কারাগারে মোট বন্দী ধারণ ক্ষমতা ৩৬ হাজার ৭১৪ জন। ঢাকায় ৪ হাজার ৫৯০ জন ধারণ ক্ষমতার বিপরীতে বন্দী আছেন ১১ হাজার ৩২৫। কারা অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কারাগারগুলোতে সব সময় ধারণ ক্ষমতার চাইতে বেশি বন্দী থাকে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। পুলিশের বিশেষ অভিযান চলমান থাকায় প্রতিদিন বন্দীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, হবিগঞ্জ, সিলেট, সাতক্ষীরা, বগুড়া, জয়পুরহাট, লালমনিরহাট, রাজশাহী, গাইবান্ধা, যশোরসহ বেশ কয়েকটি জেলার কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারের বন্দী সংখ্যা অনেক বেড়েছে।
এ ব্যাপারে কারা অধিদফতরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, গত সাত মাস ধরে দেশের কারাগারগুলোতে ৯০ হাজার থেকে ৯২ হাজার বন্দী সংখ্যা ওঠানামা করে। এখন বর্তমানে কারাগারে বন্দী রয়েছে প্রায় ৯৬ হাজার।
কারা ফটকে স্বজনদের আকুতি
‘আমার স্বামী তো ভ্যান চালাইত। আর কিছু করত না। তাকে একদিন পুলিশ বাসা থাইক্যা ধইরা নিয়া গেল। পরে শুনি, ওরে নাকি মামলা দিয়া চালান দিছে। কিচ্ছু পায় নাই, উল্টা বড়ি ঢুকায় দিয়া কইছে, হেয় নাকি মাদকের ব্যবসা করে।’ গতকাল কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে এসব কথা বলছিলেন মাদকের মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা লিটন মিয়ার (৩০) স্ত্রী মুক্তা বেগম। তিনি জানান, লিটন মিয়া কুমিল্লার হোমনা উপজেলার তুলাতুলি শিবনগর গ্রামের সুরুজ আলীর ছেলে। এক মেয়ে ও স্ত্রী মুক্তাকে নিয়ে ঢাকার শ্যামবাজারে থাকেন এবং সেই এলাকায় ভ্যান চালাতেন। ৫ নভেম্বর লিটনকে আটক করে পুলিশ। এরপর তাকে মাদক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠালে তার ঠিকানা হয় কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগার। তবে এখন পর্যন্ত তার মামলায় লড়ার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আইনজীবী নিয়োগ করা হয়নি। এ কারণে কবে এবং কখন তিনি কারাগার থেকে ছাড়া পাবেন, তা জানেন না তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা।
ওয়ারী থেকে আসা ২৫ বছর বয়সী এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, তার স্বামী জাকির হোসেন ঝালাইয়ের কাজ করতেন। ৯ ডিসেম্বর তাকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে তাকে একটি মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। সেদিনের পর থেকে জাকিরের ঠিকানা কারাগার। স্বামীকে এক নজর দেখতে এসেছেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে ছিল ছোট মেয়ে লাবিবা ও জাকিরের শাশুড়ি। সকাল থেকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দুপুরের দিকে টিকিট কেটে অনুমতি পান স্বামীর সঙ্গে দেখা করার। ওই নারী জানান, তার স্বামী জাকিরকে কেন আটক করা হয়েছে, তা তিনি জানেন না। তবে জানতে পেরেছেন, জাকিরকে সন্দেহজনক কারণে আটক করা হয়েছে। স্বামী কবে ছাড়া পাবেন, আর কবে থেকে তার সংসারে আয়ের চাকা সচল হবে তাও অজানা তার।
রাজীব সরকার (২২) মিরপুর বাঙলা কলেজের অনার্সের ছাত্র। বাড়ি মুন্সীগঞ্জ সদরে। ১২ নভেম্বর তাকে আটক করে রূপনগর থানা পুলিশ। তার কোনো মামলা ছিল না দাবি করেন তার বড়ভাই ফারুক হোসেন। তিনি অভিযোগ করেন, আটকের পর একটি পুরনো রাজনৈতিক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।
