করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষার পরিধি যত বাড়ছে তত বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে। কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ মোট ১ হাজার ৫৭০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এরমধ্যে ১৮২ জনের মধ্যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। এ নিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে হয়েছে ৮০৩ জন। অর্থাত্ সর্বোচ্চ পরীক্ষা, সর্বোচ্চ শনাক্ত। সোমবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরো ৫ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৯ জন। এমন অবস্থার মধ্যে সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোও করোনা রোগীদের চিকিত্সা সেবার জন্য প্রস্তুত করছে সরকার। এদিকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে লকডাউন জোরদার করার তাগিদ দিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, এপ্রিল মাসে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ফলে এপ্রিল মাস সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। এ সময় রোগটি নিয়ন্ত্রণে জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা এবং উপজেলা পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। যেহেতু রোগটি কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়েছে, তাই বিভিন্ন স্তরে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করতে হবে। যাতে দ্রুত শনাক্ত করে রোগীকে আইসোলেশনে রাখা যায়। এভাবেই করোনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই একই কথা বলে আসছেন। কিন্তু শুরুতে একগুয়েমির কারণে পরীক্ষার পরিধি বাড়েনি।
করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সা সেবায় বড়ো ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ডাক্তারদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। করোনা রোগীদের সুচিকিত্সা নিশ্চিত করতে দ্রুত বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করতে হবে। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, এই পরিস্থিতিতে রেসপেটরি মেডিসিন, বক্ষব্যাধী বিশেষজ্ঞ, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, এনেসথেলজিস্ট ও ইপিডিওমোলজিস্ট—এই পাঁচ ধরনের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং টিম গঠন করা জরুরি। তিন শিফটে এই টিম কাজ করবে। সেখানে অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখতে হবে। যাতে কোথাও করোনা আক্রান্ত রোগী চিহ্নিত হলে কিংবা সর্দি, কাশি, জ্বর, গলায় ব্যথা নিয়ে কোনো রোগী হাসপাতালে গেলে অথবা আইসোলেশনে কোনো রোগীর চিকিত্সা সেবা নিয়ে ফোনে এই বিশেষজ্ঞ টিমের তাত্ক্ষণিক পরামর্শ দিতে পারবেন। যে হাসপাতালে রোগী থাকবে ঐ হাসপাতালের ডাক্তাররা রোগীর পরিস্থিতি সম্পর্কে জানালে ফোনে বিশেষজ্ঞরা তাত্ক্ষণিক সেবা দিতে পারবেন। রোগীর কাছেও যেতে পারেন। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালসহ যেকোনো হাসপাতালে যারা চিকিত্সাধীন আছেন, ঐ সব হাসপাতাল থেকে কর্তব্যরত চিকিত্সকরা রোগীদের শারীরিক অবস্থা জানালেই বিশেষজ্ঞ টিম তাত্ক্ষণিক চিকিত্সা সেবা দিবেন। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্তের পর রাজধানীর কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে এ সংক্রান্ত চিকিত্সা সেবা দেওয়া হচ্ছে। এই হাসপাতালটিই করোনা রোগীদের প্রধান সেবা কেন্দ্র। কিন্তু কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে চিকিত্সা সেবা প্রদানে ডাক্তারদের মধ্যে নেই কোনো সমন্বয়। বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন না হওয়ায় রোগী সঠিক সেবা পাচ্ছেন না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে যুক্ত হয়ে দেশে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরেন। অন্যদিন আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা ব্রিফিংয়ে যুক্ত হয়ে আক্রান্ত ও মৃতদের বয়স, এলাকাসহ বিভিন্ন তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রস্তুতির বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন ব্রিফিংয়ে। করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে চেম্বারে বসছেন না অনেক চিকিত্সক; অনেক জায়গায় টেকনিশিয়ানরা কর্মস্থলে না থাকায় রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষাও বন্ধ আছে বলে রোগীদের কাছ থেকে অভিযোগ আসছে। কয়েক হাসপাতাল ঘুরেও চিকিত্সা না পেয়ে রোগীর মৃত্যু এবং রোগী রেখে চিকিত্সকদের পালিয়ে যাওয়ার খবরও গণমাধ্যমে এসেছে। তবে এখন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতাল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। উনারা এগিয়ে এসেছেন দেশবাসীর সেবায়। তারা তাদের বেশ কয়েকটি হাসপাতাল এই কোভিড-১৯ রোগীর চিকিত্সার জন্য দিতে চাচ্ছেন।’ স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা শহরের মধ্যে যে হাসপাতালগুলো আমরা নেব, তার মধ্যে ৫০০ শয্যার শাহাবুদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ৭০০ শয্যার আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল—এগুলো সবই ভালো হাসপাতাল, সেখানে আইসিইউ রয়েছে। এছাড়া প্রত্যেক জেলায় বেসরকারি হাসপাতাল যেগুলো আছে, তারা এগিয়ে আসছেন, তাদের হাসপাতালগুলোও আমরা তালিকাভুক্ত করে নিচ্ছি।’ জাহিদ মালেক জানান, প্রতিটি জেলার মেডিক্যাল কলেজ, হাসপাতাল ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যারা করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা করাতে আগ্রহী, তাদেরও অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভবন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পুরাতন বার্ন ইউনিট, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল ও পঙ্গু হাসপাতালের পুরোনো একটি অংশকে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সার জন্য নির্ধারিত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিত্সার জন্য সারা দেশে ৭ হাজার ৬৯৩টি আইসোলেশন শয্যা এবং ১১২টি আইসিইউ শয্যা প্রস্তুত রাখা রয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন। তবে চিকিত্সা ব্যবস্থার উন্নতি করেও সব রোগীকে হাসপাতালে সেবা দেওয়া যে কঠিন হবে, সে কথা স্বীকার করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আমাদের হাসপাতাল ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা তো মজবুত করছি। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে, হাসপাতালে লাখ লাখ রোগীর চিকিত্সা দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ভেন্টিলেটর সঙ্কট যে পুরো পৃথিবীজুড়েই আছে, সে কথা তুলে ধরে জাহিদ মালেক বলেন, ‘আরো ৪০০-৫০০ নতুন ভেন্টিলেটর আনার ব্যবস্থা হচ্ছে।’ গত এক দিনে আরো তিন জন সুস্থ হয়ে ওঠায় এ পর্যন্ত মোট ৪২ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।
