প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘরের বাইরে নববর্ষের সব অনুষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘এটা করা হয়েছে বৃহত্তর জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে। কারণ এরই মধ্যে এই ভাইরাস আমাদের দেশেও ভয়াল থাবা বসাতে শুরু করেছে।’ ১৪২৭ বঙ্গাব্দের বাংলা নববর্ষের প্রাক্কালে গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। ভাষণটি বেতার ও টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার হয়। সংকটের এই সময়ে এ নিয়ে গত এক মাসে তৃতীয়বার জনগণের সামনে এলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে বলেছেন, জাতি সম্মিলিতভাবে করোনা ভাইরাসজনিত মহামারিকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, নতুন বছরে মহান আল্লাহর কাছে কায়মনবাক্যে প্রার্থনা, এই প্রলয় দ্রুত থেমে যাক। সবাই ভালো ও সুস্থ থাকুন। যে আঁধার আমাদের চারপাশকে ঘিরে ধরেছে, তা এক দিন কেটে যাবেই। বৈশাখের রুদ্র রূপ আমাদের সাহসী হতে উদ্বুদ্ধ করে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করুন, পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করুন। কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের গুজবে বিভ্রান্ত না হতে দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা ভয় পাবেন না। ভয় মানুষের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে। কেউ আতঙ্ক ছড়াবেন না। আমাদের সবাইকে সাহসের সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। সরকার সব সময় আপনাদের পাশে আছে।’ দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সঠিক তথ্য তুলে ধরে এই মহামারি মোকাবিলা করতে সরকারকে সহায়তা করার জন্য মিডিয়াকর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেন, বাঙালির সর্বজনীন উত্সব বাংলা নববর্ষ। প্রতিটি বাঙালি আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে উদ্যাপন করে থাকেন এ উত্সব। এ বছর বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের মহামারির কারণে পয়লা বৈশাখের ঘরের বাইরের সব অনুষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এটা করা হয়েছে বৃহত্তর জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে। কারণ, এরই মধ্যে এ ভাইরাস আমাদের দেশেও ভয়াল থাবা বসাতে শুরু করেছে। ইতিপূর্বে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর উদ্বোধন অনুষ্ঠান এবং স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানও জনসমাগম এড়িয়ে রেডিও, টেলিভিশন এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সম্প্রচার করা হয়েছে। পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানও আমরা একইভাবে উদ্যাপন করব।
দেশবাসীকে উদ্দেশ করে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, আমরা ঘরে বসেই এবারের নববর্ষের আনন্দ উপভোগ করব। কবিগুরুর কালজয়ী গান ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো/মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’ গেয়ে আহ্বান করব নতুন বছরকে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমগ্র বাংলাদেশে এবং প্রবাসে বাঙালিরা বাংলা নববর্ষ আনন্দঘন পরিবেশে উদ্যাপন করে থাকেন। রাজধানীতে রমনা পার্ক, চারুকলা চত্বর, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ নগরীর নানা স্থান মানুষের ভিড়ে মুখরিত থাকে এ দিনটি। গ্রামীণ মেলা, হালখাতাসহ নানা অনুষ্ঠানে গোটা দেশ মেতে উঠে। তবে এবার সবাইকে অনুরোধ করব—কাঁচা আম, জাম, পেয়ারা, তরমুজসহ নানা মওসুমি ফল সংগ্রহ করে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাড়িতে বসেই নববর্ষের আনন্দ উপভোগ করুন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সাসেবা প্রদানে জড়িত চিকিত্সক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দেশবাসীর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন—চিকিত্সক, নার্সসহ অন্য স্বাস্থ্যকর্মীগণ সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং মৃত্যুঝুঁকি উপেক্ষা করে একেবারে সামনের কাতারে থেকে করোনা ভাইরাস-আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। আপনাদের পেশাটাই এ রকম চ্যালেঞ্জের। এই ক্রান্তিকালে মনোবল হারাবেন না। গোটা দেশবাসী আপনাদের পাশে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি দেশবাসীর পক্ষ থেকে আপনাদের (চিকিত্সক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী) সবাইকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। যেসব সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী প্রত্যক্ষভাবে করোনা ভাইরাস রোগীদের নিয়ে কাজ করছেন ইতিমধ্যেই তাদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছি। তাদের বিশেষ সম্মানী দেওয়া হবে। এজন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। আর করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে চিকিত্সক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সশস্ত্র বাহিনী ও বিজিবি সদস্য এবং প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য কর্মচারীর জন্য বিমার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দায়িত্ব পালনকালে যদি কেউ আক্রান্ত হন, তাহলে পদমর্যাদা অনুযায়ী প্রত্যেকের জন্য থাকছে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার স্বাস্থ্যবিমা এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রে এর পরিমাণ পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পাবে। স্বাস্থ্যবিমা ও জীবনবিমা বাবদ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৭৫০ কোটি টাকা।’ একই সঙ্গে সাধারণ রোগীরা যাতে কোনোভাবেই চিকিত্সাসেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সেদিকে নজর রাখার জন্য প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি আরো বলেন, করোনাভাইসের কারণে গোটা বিশ্ব আজ অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা আভাস দিচ্ছে। আপনারা জানেন, এই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে কোয়ারেন্টাইন। অর্থাত্ নিজেকে ঘরবন্দি করে রাখা। বিশ্বের ২৫০ কোটিরও বেশি মানুষ আজ ঘরবন্দি। কোথাও লকডাউন, কোথাও গণছুটি আবার কোথাও কারফিউ জারি করে মানুষকে ঘরবন্দি করা হয়েছে। বাংলাদেশেও গত ২৫ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত একটানা ৩২ দিন সাধারণ ছুটি বলবত্ হয়েছে। জরুরি সেবা কার্যক্রম ছাড়া সবকিছু বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আজ দেশের সিংহভাগ শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং ছোটোখাটো কারখানা বন্ধ। গণপরিবহন ও বিমান চলাচল স্থগিত। আমাদের আমদানি-রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে বেশির ভাগ দেশে প্রবাসী ভাইবোনেরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। স্থবিরতা নেমে এসেছে রেমিট্যান্স প্রবাহে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিশ্ব ব্যবস্থার বাইরে নই। বিশ্বের অর্থনৈতিক মন্দার ধাক্কা আমাদের অর্থনীতির জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা জানি না, এই সংকট কত দিন থাকবে এবং তা আমাদের অর্থনীতিকে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তবুও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমরা ইতিমধ্যে ৯৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি। যা জিডিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।’ প্রধানমন্ত্রী করোনা ভাইরাসের কারণে অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাব উত্তরণে চারটি মূল কার্যক্রম নির্ধারণের কথা জাতির সামনে তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আগামী তিন মাসে ৭৪ হাজার মেট্রিক টন চাল এই কার্যক্রমের আওতায় বিতরণ করা হবে। এজন্য ২৫১ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদান করতে হবে। দিনমজুর, রিকশা বা ভ্যানচালক, মোটর শ্রমিক, নির্মাণ শ্র্রমিক, পত্রিকার হকার, হোটেল শ্র্রমিকসহ অন্যান্য পেশার মানুষ যারা দীর্ঘ ছুটি বা আংশিক লক-ডাউনের ফলে কাজ হারিয়েছেন ব্যাংক হিসাবসহ তাদের নামের তালিকা দ্রুত তৈরির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই তালিকা প্রণয়ন সম্পন্ন হলে এককালীন নগদ অর্থ সরাসরি তাদের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হবে। এ খাতে ৭৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর উদ্দেশে আরো বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে গত মৌসুমে আমাদের রোপা আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। চলতি মৌসুমে বোরো ধানেরও ভালো ফলন হওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। খাদ্য ও কৃষি পণ্য সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা অটুট রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনেক সদাশয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানও দরিদ্র জনগণের সহায়তায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণে এগিয়ে এসেছেন। তবে, এসব ত্রাণসামগ্রী ও সহায়তা বিচ্ছিন্নভাবে না বিলিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং আইশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে শৃঙ্খলার সঙ্গে বিতরণ করা প্রয়োজন। তা না হলে ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা থেকে যাবে। আমি বিত্তবানদের এই সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানাচ্ছি। যে আঁধার আমাদের চারপাশকে ঘিরে ধরেছে, তা একদিন কেটে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
