করোনা ভাইরাসের ভয়াল থাবায় ধীরে ধীরে অস্থির হয়ে উঠছে গার্মেন্টস খাত। সরকারি সাধারণ ছুটি বর্ধিত করা এবং কিছু এলাকা লকডাউনের সুযোগে একশ্রেণির মালিক পক্ষ মজুরি দেওয়ার ক্ষেত্রে গড়িমসি করছেন। আবার আইনের তোয়াক্কা না করে কোনো কোনো কারখানা মালিক শ্রমিক ছাঁটাই কিংবা কারখানা লে-অফের (সাময়িক বন্ধ) নোটিশও দিচ্ছেন। ফলে দিনে দিনে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে এ খাত। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই রাস্তায় নেমে আসছেন শ্রমিকরা। কয়েক দিনের ধারাবাহিকতায় গতকালও মার্চ মাসের বেতনের দাবি ও ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে শ্রমিকরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শ্রমিকের মজুরি পরিশোধে কড়া বার্তা দিয়েছে সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয়। গতকাল এক বিবৃতিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান ১৬ এপ্রিলের মধ্যে সব ধরনের শিল্পকারখানার শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন। নির্দেশনা না মানলে সংশ্লিষ্ট মালিকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতার কথা মাথায় রেখে সরকারি নির্দেশনা মেনে শ্রমিকদের ঘরে থাকার আহ্বানও জানানো হয়।
গতকাল সোমবারও এসব ইস্যুতে রাস্তায় নেমেছে অন্তত ১১টি কারখানার (গার্মেন্টস এবং অন্যান্য) শ্রমিকরা। এর মধ্যে গাজীপুরের টঙ্গিতে আলাউদ্দিন অ্যান্ড সন্স লিমিটেড, কাশিমপুরের ডেল্টা নিট কম্পোজিট, জে আর ফ্যাশন লিমিটেড, অক্সফোর্ড শার্টস, সাত্তার টেক্সটাইল, ন্যাশনাল কম্পোজিট, এটিএস অটো সোয়েটার, স্টাইলিশ গার্মেন্টস। এছাড়া একই এলাকায় ফার সিরামিকের কারখানায়ও শ্রম অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে আশুলিয়ায় রাকেশ অ্যাপারেলস এবং পাবনা নিট কারখানায় শ্রমিকরা রাস্তায় নেমেছে বলে জানা গেছে।
শিল্পাঞ্চল পুলিশের আওতাধীন এলাকায় গার্মেন্টস, টেক্সটাইল ও অন্যান্য খাত মিলিয়ে শিল্পকারখানার সংখ্যা ৭ হাজার ৬০২টি। এর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত মার্চের বেতন পরিশোধ করেছে ৩১ শতাংশ কারখানা। শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, এর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ১ হাজার ৮৮২টি কারখানার মধ্যে ৪৭৬টি কারখানা গত মাসের বেতন পরিশোধ করেছে। এছাড়া বিকেএমইএ সদস্যভুক্ত ১ হাজার ১০১টি কারখানার মধ্যে বেতন পরিশোধ করেছে ২০৪টি। বিটিএমএর সদস্যভুক্ত ৩৮৯টির মধ্যে ৭৭টি, বেপজার আওতাধীন ৩৬৪টির মধ্যে ৩০৩টি এবং অন্যান্য খাতের ৩ হাজার ৮৬৬টি কারখানার মধ্যে ১ হাজার ২৭৫টি কারখানা বেতন পরিশোধ করেছে। অন্যদিকে গতকাল শিল্পাঞ্চলগুলোতে গার্মেন্টসসহ ৪০৩টি কারখানা খোলা ছিল।
অবশ্য বিজিএমইএর হিসাব অনুযায়ী, সংগঠনটির সদস্যভুক্ত কারখানাগুলোর মধ্যে ৭৭ শতাংশ শ্রমিক মজুরি পেয়েছেন। এই তথ্যের সঙ্গে শিল্পাঞ্চল পুলিশের তথ্য সাযুজ্যপূর্ণ নয়। তবে কারখানা মালিকরা জানিয়েছে, যেসব কারখানায় অপেক্ষাকৃত বেশি শ্রমিক, সেসব কারখানা মজুরি পরিশোধ করায় কারখানার হারের চেয়ে বেতন পাওয়া শ্রমিকের হার বেশি। এর অর্থ হলো, অপেক্ষাকৃত ছোটো কারখানাগুলোতে মজুরি পরিশোধের হার কম। বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক ইত্তেফাককে বলেন, তাদের সদস্যভুক্ত ২ হাজার ২৭৪টি কারখানার মধ্যে ৯১৭টি কারখানার শ্রমিকরা মজুরি পেয়েছেন। গতকাল নাগাদ ৭৭ শতাংশ শ্রমিক তাদের মজুরি পেয়েছেন।
আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে গাজীপুর মহানগরীর সালনা এলাকায় অক্সফোর্ড শার্ট লিমিটেড নামের একটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সোমবার দুপুরে লকডাউন অমান্য করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। এ সময় সড়ক অবরোধের কারণে জরুরি পণ্যবাহী গাড়ি আটকা পড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়।
আন্দোলনরত শ্রমিকরা জানায়, সোমবার বেতন পরিশোধের কথা ছিল। ছয় মাসের কম কাজ করছে এমন শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করে তাদের পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বলে কারখানা কর্তৃপক্ষ। এনিয়ে তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। দুপুরে শ্রমিকরা তাদের কাজে পুনর্বহাল এবং ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন। সদর থানার ওসি আলমগীর ভুঁইয়া জানান, কারখানা কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়েছে। ২৫ এপ্রিল কারখানা খুললে এ শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
সাভার থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, বকেয়া বেতনের দাবিতে সাভারের হেমায়েতপুরের রাকিব অ্যাপারেলস নামের একটি পোশাক কারখানায় বিক্ষোভ ও পরবর্তীতে সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। পুলিশ এসে শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। শ্রমিকরা জানায়, গত জানুয়ারি মাস থেকে তাদের বেতন দেওয়া হচ্ছে না।
