সুবোধ চন্দ্র বিশ্বাস
‘নিজের মধ্যে মানুষের প্রাণটা নানা ভাবনায় ঘোলা হয়ে গেছে। তাই, প্রাণের বিশুদ্ধ রূপটি দেখতে হলে চাইতে হয় ঐ ঘাসের দিকে, ঐ গাছের দিকে।’ কথাটি আরেকবার পড়ুন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিয়া গিয়াছেন। করোনা নামের এক কালবেলা বিশ্বজুড়ে ত্রাস সৃষ্টি করবে, এটা তিনি জানতেন না। কিন্তু যান্ত্রিক সভ্যতা আমাদের প্রাণটাকে কীভাবে ঘোলা করে ফেলছে, সেটা সেই শতবর্ষ আগেই তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। এখন এই করোনা-কালে চারদিকে গুজবের গজব পড়েছে। আপনি ফেসবুকের মেসেনজারে, হোয়াটসঅ্যাপে দেখবেন আপনার হিতাকাঙ্খী মানুষেরা কত ধরনের অদ্ভুত সব মেসেজ পাঠাচ্ছে। তারা ভালো মনে করেই পাঠাচ্ছে সেগুলো। কিন্তু কোনটা সত্যি আর কোনটা গুজব, সেটা তারাও জানে না।
কী অদ্ভুত ধরনের গুজব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, সেটা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। আমাদের দেশে এখনো ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক চালু হয় নাই। কিন্তু যেসব দেশে চালু হয়েছে, সেখানে গুজব রটেছে ফাইভ-জি মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নাকি করোনা ছড়াচ্ছে! তারা কিন্তু উন্নত বিশ্বের মানুষ! আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, ওরা যদি এমন কথা বিশ্বাস করে তাহলে আমাদের আর দোষ কী? আপনি হয়তো শুনে থাকতে পারেন, রোদের তাপ নাকি করোনা প্রতিরোধ করে! হ্যাঁ, রোদের তাপে আপনার শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি হতে পারে এবং তাতে রোগ প্রতিরোধ শক্তি কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পেতেও পারে। কিন্তু তাপমাত্রা যত বেশিই হোক না কেন, যেকোনো তাপমাত্রায় আপনি করোনায় সংক্রমিত হতে পারেন। গরমেও করোনা ছড়াতে পারে নিজস্ব গতিতে। জেনে রাখবেন, বাইরের তাপমাত্রা যাই হোক না কেন আপনার শরীরের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আপনি এমন মেসেজ পেয়ে থাকতে পারেন যে, ১০ সেকেন্ড যদি শ্বাস আটকে রেখে দেখেন আপনার কোনো কষ্ট হচ্ছে না, কাশি আসছে না, তাহলে আপনি করোনামুক্ত। ভুয়া, ১০০ ভাগ ভুয়া। কারণ করোনা ভাইরাস কারো শরীরে প্রবেশের চার থেকে ১৪ দিন পর তার শরীরে রোগ প্রকাশ পায়। রোগ প্রকাশের আগে কিন্তু শরীরে করোনা থাকলেও ঐ ব্যক্তি বাহ্যত সুস্থই থাকেন।
আপনি নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন, ইরানসহ কিছু কিছু জায়গায় বিষাক্ত মদ খেয়ে অনেকেই মারা গেছেন। কারণ গুজব রটেছে যে বেশি বেশি মদ বা অ্যালকোহল খেলে করোনা প্রতিরোধ হয়। বুঝতেই পারছেন বেশি বেশি অ্যালকোহল শরীরে প্রবেশ করলে আপনার ভবলীলা এমনিতেই সাঙ্গ হয়ে যাবে, করোনার দরকার পড়বে না। হ্যান্ড ড্রায়ার করোনা মারে বলে মনে করেন অনেকে। মনে রাখবেন হাত শুকানোর যে মেশিন, করোনা ভাইরাসের উপর তার কোনো প্রভাব নেই। আপনার যা করণীয় তা হলো—বার বার সবান পানি বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোয়া। এরপর টিস্যু, তোয়ালা বা গরম ড্রায়ার দিয়ে হাত শুকাতেও পারেন. সেটা অতিরিক্ত ব্যাপার।
অনেকের বিশ্বাস নাকের ড্রপ থেকে করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচা যেতে পারে। এমন কোনো তথ্য কিন্তু এখনো প্রমাণিত হয়নি। নিয়মিত স্যালাইন পানি দিয়ে আপনি এমনিতে নাক পরিষ্কার করতে পারেন, তবে তা করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ করে না। করোনা প্রতিরোধে বিশেষ কোনো ওষুধ আছে কিনা, এ নিয়েও জল্পনার শেষ নেই। যক্ষ্মার জন্য ছোটোবেলায় দেওয়া বিসিজি টিকা নাকি করোনা প্রতিরোধে সহায়তা করে—এমন কথাও ঘুরে বেরিয়েছে ভার্চুয়াল অর্ন্তজালে। এগুলো এখনো প্রমাণিত নয়। কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী শুরু করেছে চার ওষুধের মেগাট্রায়াল—হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন, এইডসের ওষুধ লোপিনাভির-রিটোনাভির, ইবোলার ওষুধ রেমডিসিভির’ ও ইন্টারফেরন বিটা। এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও মারাত্মক। সত্যিকার অর্থে, করোনা প্রতিরোধে এখন পর্যন্ত কোনো ওষুধ নেই। কেবল লক্ষণ অনুযায়ী এ রোগে আক্রান্তদের চিকিত্সা দিচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিত্সকেরা। সুতরাং করোনা থেকে বাঁচতে হলে ঘরে থাকুন, ঘরে থাকুন এবং ঘরে থাকুন। আর গুজব কম ছড়ান।
n লেখক : সাংবাদিক, শিক্ষক
