কবি রজনীকান্ত সেন তাহার কবিতায় বলিয়াছেন, ‘নদী কভু পান নাহি করে নিজ জল,/তরুগণ নাহি খায় নিজ নিজ ফল,...।’ কিন্তু বাংলাদেশে অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে, নদী নিজেই জল পান করিয়া ফেলিতেছে, তরুগণ নিজেই ফল খাইয়া ফেলিতেছে! তাহা না হইলে যেই এলাকার মানুষ তাহার প্রতিনিধি হিসাবে একজনকে বাছিয়া লইয়াছে, তিনি কী করিয়া সেই জনতার ত্রাণ চুরি করিবার প্রয়াস পাইতেছেন! ভয়, ডর, লজ্জা, শরম—কোনো কিছুরই যেন বালাই নাই।
ইহা আমাদের নিকট বড়োই বেদনাদায়ক বলিয়া ঠেকিতেছে। প্রধানমন্ত্রী, অর্থাত্ দেশের প্রধান নির্বাহী প্রায় প্রতিদিন বলিতেছেন, ত্রাণ লইয়া অন্যায় অপকর্ম সহ্য করা হইবে না। বুধবারও তিনি একই কথা জোর দিয়া বলিয়াছেন। সেই খবর দেশের বড়ো-ছোটো সকল পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছে; কিন্তু তাহার ছবিও সংবাদের পাশেই বড়ো করিয়া পত্রিকার পাতায় ছাপা হইতেছে ত্রাণ চুরির কাহিনি। একটি বা দুইটি নহে, প্রায় সারাদেশ হইতে ডজন ডজন চুরির খবর আসিতেছে। ঐ ছবি দেখিয়া তখনই আমাদের চোখে প্রধান নির্বাহীর ছবিখানা মলিন, বিমর্ষ প্রতীয়মান হইতেছে। মনে হইতেছে কোথাও কেহ নাই! করোনা ভাইরাসের এই ভয়াবহ দুঃসময়ে তাহাকে অসহায় মনে হইতেছে। অথচ তিনিই দেশের প্রধান নির্বাহী! ইহা বলিতেই হইবে, তাহার প্রচেষ্টার কোনো শেষ নাই, নিষ্ঠা ও সদিচ্ছারও কোনো ঘাটতি নাই। তিনি আপ্রাণ চেষ্টা চালাইয়া যাইতেছেন স্বচ্ছতার সহিত বিলিবণ্টনের মাধ্যমে দেশের ক্ষুধার্ত, অভাবগ্রস্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করিবার। দিনরাত্রি পরিশ্রম করিতেছেন; কিন্তু কাহাকে লইয়া তিনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করিবেন! চারিদিকে অবিশ্বাসীর চক্ষু। দেশের প্রধান নির্বাহী কি একা সকলকিছু সামলাইতে পারেন? অথচ তাহার চারিপাশে যাহারা ঘুরঘুর করিতেছেন তাহাদের একটি বড়ো অংশকেই কোনোক্রমে বিশ্বাস করা যায় না। প্রধান নির্বাহীকে আমাদের স্মরণ করাইয়া দেওয়া কর্তব্য, আজ জনগণের বিরাট একটি অংশ আপনার পাশে রহিয়াছে; কিন্তু যদি কখনো এই জনগণ সরিয়া যায় তাহা হইলে সেই সকল সুবিধাবাদীকে খুঁজিয়াও পাওয়া যাইবে না।
কেহ কেহ ত্রাণের বিষয়টি পুরোপুরি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপর ছাড়িয়া দিবার কথা বলিতেছেন; কিন্তু তাহাই বা কতটা যৌক্তিক হইবে? দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রায় ১৪ লক্ষ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী রহিয়াছেন। তাহারা নিবিড়ভাবে এই ত্রাণকার্যের সহিত যুক্ত আছেন। তাহারাই বা কতটা পেশাদারিত্ব প্রদর্শন করিতে পারিয়াছেন? এই দেশ লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হইয়াছে, কয়েক লক্ষ নারীর ইজ্জতের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা পাইয়াছেন। তাহাদের ত্যাগ এইভাবে বৃথা যাইতে দেওয়া যায় না। এই যে চারিপাশে ঔদ্ধত্য, ইহা কোনোক্রমেই মানিয়া লওয়া যায় না। সুতরাং এইক্ষেত্রে কোনো আপস হইতে পারে না। এই ত্রাণ আত্মসাত্কারীরা যত শক্তিশালী হউক, সংখ্যায় যত বেশি হউক তাহাদের কঠোরভাবে দমন করিতে হইবে।
