সম্প্র্রতি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়া বলিয়াছে যে, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ চরম হুমকির মধ্যে পড়িতে পারে। বিভিন্ন দেশে লকডাউনের কারণে সীমান্ত বন্ধ, চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নৌ-সমুদ্র ও আকাশ পথে পণ্য পরিবহনে প্রতিবন্ধকতায় খাদ্য উত্পাদন ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিবহনের কাজ আজ কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। এই অবস্থায় দেশীয় খাদ্য উত্পাদন ও সরবরাহ লাইন যথাসম্ভব ঠিক রাখিতে পারিলে এই মহাদুর্যোগকালেও আমাদের খাদ্যসংকট তেমন প্রকট হইবে বলিয়া মনে হয় না; কিন্তু কিছুদিন ধরিয়া ধান কাটিবার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক সংকটের যে কথা বলা হইতেছে তাহা উদ্বেগজনক। এখন বোরো ধান কাটিবার মোক্ষম সময়। কৃষকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই বত্সর ফলনও ভালো হইয়াছে; কিন্তু ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, শ্রমিক সংকটে সময়মতো বোরো ধান কাটিতে না পারিলে এইবার প্রায় ১৯ লক্ষ ৪৫ হাজার টন চাউল নষ্ট হইবার আশঙ্কা রহিয়াছে। তাহাদের মতে, বর্তমানে দেশের ২৬ জেলায় বিভিন্ন মাত্রায় শ্রমিকের অভাব রহিয়াছে। এখন অন্যান্য জেলা হইতে শ্রমিক আনিয়া এই চাহিদা মিটাইতে হইবে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) গবেষণা মতে, কৃষি শ্রমিকের তীব্র সংকট রহিয়াছে অনেক জেলায়। এখন যেই সকল জেলায় শ্রমিক উদ্বৃত্ত রহিয়াছে, সেই সকল জেলার শ্রমিকরা যাহাতে করোনা দুর্যোগকালে সামাজিক দূরত্ব ও অন্যান্য নিয়ম মানিয়া সংকটপূর্ণ জেলায় সহজে যাতায়াত করিতে পারে, তাহার ব্যবস্থা করা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। যদিও ইতিমধ্যে বিভিন্ন জেলা প্রশাসন হইতে জানানো হইয়াছে যে, ত্বরিত তাহারা পর্যাপ্ত শ্রমিক পাইলেই বিভিন্ন জেলায় প্রেরণের ব্যবস্থা করিবেন।
চলতি বোরো মৌসুমে আমাদের ২ কোটি ৪ লক্ষ ৩ হাজার টন চাউল উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা রহিয়াছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এবার ৪৭ লক্ষ ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হইয়াছে।
ইতিমধ্যে হাওর অঞ্চলে স্বল্পপরিসরে ধান কাটা শুরু হইয়াছে। চলতি সপ্তাহে পুরাদমে শুরু হইবে এই ধান কাটা অভিযান; কিন্তু যেইখানে শুধু হাওর অঞ্চলের ৪ লক্ষ ৪৫ হাজার হেক্টর জমির ধান কর্তনের জন্য প্রায় ৮৪ লক্ষ শ্রমিক প্রয়োজন, সেইখানে এই অঞ্চলটিতে শ্রমিকের ঘাটতি রহিয়াছে প্রায় ১৫ লক্ষ ১২ হাজার। এই অবস্থায় কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টারসহ কৃষিযন্ত্রের কার্যকর ব্যবহার বাড়ানোও প্রয়োজন। এই সকল মেশিন ৫০ শতাংশ ভর্তুকিতে সরবরাহের যে কার্যক্রম রহিয়াছে তাহা জোরদার করা আবশ্যক। ইহার পাশাপাশি করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে শ্রমিক চলাচলে স্বাস্থ্যবিধি যথারীতি মানিয়া চলিবার জন্য কৃষকদের প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন মাস্ক, গ্লাভস ইত্যাদি সরবরাহেরও ব্যবস্থা করা জরুরি। মনে রাখা দরকার, বাঁচিতে হইলে কৃষি অর্থনীতিকেও বাঁচাইয়া রাখিতে হইবে।
