ফিরে দেখা

মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকার

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২০, ২১:৩৫

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সামরিকবাহিনী বাংলাদেশের নিরস্ত্র জনগণের ওপর গণহত্যা চালায়। ১০ এপ্রিল পর্যন্ত তত্কালীন আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্বে দেশের সাধারণ মানুষ শত্রুর বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

১০ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দ (এমএনএ ও এমপিএ) সর্বসম্মতিক্রমে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে এক গণপ্রজাতন্ত্রী সরকারের ঘোষণা দেন। ঐদিন ‘স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা’ করা হয়। এই ঘোষণায় শেখ মুজিবুর রহমানের সকল কাজ বিশেষত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত ২৬ মার্চ তাঁর প্রদত্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা অনুসারে শত্রুর বিরুদ্ধে বাঙালির সর্বাত্মক যুদ্ধে অংশগ্রহণের কার্যকারিতা সম্পন্ন হয়। এতে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের পূর্বে দেশের সকল ক্ষমতা অর্পণ করা হয় রাষ্ট্রপতি কিংবা তাঁর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির ওপর। এই মর্মে একই দিনে ‘আইনের ধারাবাহিকতা প্রয়োগ আদেশ’ জারি করা হয়। উভয়ই ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে কার্যকর বলে গণ্য করা হয়েছে।

১৩ এপ্রিল ৬ সদস্য বিশিষ্ট যুদ্ধকালীন মন্ত্রীসভা (শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী ও এ. এইচ. এম. কামারুজ্জামান যথাক্রমে রাষ্ট্রপতি, অস্থায়ী বা উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) গঠন করা হয়। ১৪ এপ্রিল সরকারের এক আদেশ অনুসারে কর্নেল (অব) এম. এ. জি. ওসমানীকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী (মুক্তিফৌজ)-র প্রধান সেনাপতি এবং মেজর খালেদ মোশারফ, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর কে এম শফিউল্লা ও মেজর এম এ ওসমানকে যথাক্রমে সিলেট-কুমিল্লা, চট্টগ্রাম-নোয়াখালী, ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের আঞ্চলিক কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। ঐদিনই চুয়াডাঙ্গায় সরকারের মন্ত্রীসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান নির্ধারিত হলেও আগের দিন সেখানে শত্রুবাহিনীর ব্যাপক গোলাগুলির কারণে তা বাতিল হয়ে যায়।

১৭ এপ্রিল সকাল ১১টায় কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা গ্রামের এক আমবাগানে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীসভার সদস্যবৃন্দের শপথবাক্য পাঠ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশনা, কোরআন তেলাওয়াত ও গীতা পাঠের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম শতাধিক সাংবাদিক ও দর্শক-শ্রোতার উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। তারপর এই সরকারের নামকরণ প্রসঙ্গে সমবেত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে চুয়াডাঙ্গার মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ডা. আসহাব-উল হকের প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারকে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম অনুসারে ‘মুজিবনগর সরকার’ বলে অভিহিত করেন। পরে নিরাপত্তার কারণে এই সরকারের সদর দপ্তর কলকাতার ৮ নং থিয়েটার রোডের একটি বাড়িতে স্থানান্তর করা হয়।

তাত্ত্বিক মহলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারকে ‘প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার’, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’, ‘অস্থায়ী সরকার’, ‘প্রবাসী সরকার’ ও ‘মুজিবনগর সরকার’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়। ১৯৭১ সালে শত্রুকবলিত স্বদেশের মাটিতে এই সরকারের গঠন ও কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল বলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ একে ‘মুজিবনগর সরকার’ হিসেবেই জানে।

বিশ শতকে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন প্রবাসী সরকার যথা— পিএলও, আফগানিস্তান ও কম্বোডিয়া সরকার যথাক্রমে বৈরুত (লেবানন), আম্মান (জর্ডান) ও তিউনিস (তিউনিসিয়া); পেশোয়ার (পাকিস্তান); বেইজিং (চীন) ও থাইল্যান্ডে তাদের সদর দপ্তর স্থাপন করেছিল। মুজিবনগর সরকারের মতো এসব সরকার দেশের অভ্যন্তরে স্বীয় সরকারকে যথাযথভাবে পরিচালনা করেনি। অন্যদিকে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টর ও তিনটি ব্রিগেড বা ফোর্সে বিভক্তি, সেক্টরসমূহ পরিচালনায় ১১টি আঞ্চলিক প্রশাসনিক পরিষদ গঠন, সরকারের বেসামরিক কার্যক্রমের জন্য একাধিক মন্ত্রণালয় তৈরি, বহিঃবিশ্বের সহায়তার জন্য দূতাবাস স্থাপন ও কূটনীতিক প্রেরণ, ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তায় যৌথ বাহিনী গঠন, বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের মিত্র দেশগুলোর জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য ‘ট্রাভেল সার্টিফিকেট’ প্রদান প্রভৃতি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি ১৬ ডিসেম্বর বিশ্বে স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা।