গোপালপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা
ধুপাধুপ শব্দে জঙ্গলের নীরবতা ভেঙে অবিরাম চলছে শাবল। যেন মাটি খুঁড়লেই মিলবে দামি বস্তু। শাবল কাত করে চাপট দিতেই পাতলা শেকড় পুট শব্দে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে দলাপাকানো শক্ত আঁশের গুচ্ছ। তাই দেখে মা-বাবার সঙ্গে তিন শিশু খুশিতে হেই হেই করছে। যেন মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসছে যক্ষের ধন। আর সবার মুখে হাসির ঝিলিক থাকবেই না কেন। সকাল থেকে দুপুর কিছুই খাওয়া হয়নি। এ শেকড় গুচ্ছই এখন রিজিক। বলছিলাম মধুপুর উপজেলার বেড়িবাইদ ইউনিয়নের প্লট পাড়া গ্রামের আইয়ুব আলীর পরিবারের কথা। গত বুধবার মধুপুর বনাঞ্চলের বেড়িবাইদ বিটের জঙ্গলে মাটি খুঁড়ে এভাবেই সপরিবারে বন আলু সংগ্রহ করছিলেন। আইয়ুব পেশায় ভ্যানচালক। স্ত্রী মরিয়ম দিনমজুর। পাঁচ সন্তান তাদের। বড়ো ছেলে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ে। বাকিরা স্কুলে। জমি বলতে চার শতাংশের ভিটে। আইয়ুব জানান, তিন বছর আগে ধারদেনায় কেনা বকনা গর্ভবতী হয়। কিন্তু মাসখানেক আগে চুরি যায়। লিভারে অসুখ ধরা পড়েছে। টাকার অভাবে চিকিত্সা হচ্ছে না । পাশের গ্রামে করোনা শনাক্ত হওয়ায় সব গ্রাম লকডাউনে। রিকশাভ্যান বন্ধ। করোনার ভয়ে মহাজনরা আনারস ও কলার খামারে আসেন না। তাই স্ত্রীর দিনমজুরি বন্ধ। রোজগার বন্ধ থাকলেও সাত জনের পেট তো বন্ধ নেই। মরিয়ম জানান, দুই দিন ধরে খাবার নেই। আগের তিন দিন একবেলার খাবারে তিনবেলা চলেছে। সরকারি ত্রাণ মেলেনি। না খাওয়া বাচ্চারা ক্ষুধায় কান্নাকাটি করছিল। তাই ওদের সঙ্গে নিয়ে জঙ্গলে বন আলু খুঁজছি। সারাদিন খেটেখুটে চার কেজি মিলেছে। তা দিয়েই চালাব দিনদুয়েক। তারপর কী হবে জানি না। আইয়ু্ব আলীর মতো মাগন্তিনগর, জাঙ্গালীয়া, জলই, গেচ্চুয়া, গায়রা, সাধুপাড়া, সাতারিয়া, বন্দরিয়া, কাকড়াগনি, পীরগাছা, চুনিয়া গ্রামের কর্মহীন গারো ও বাঙালিরা বন আলুর খোঁজে দল বেঁধে ঘুরছে জঙ্গলে।
গারো নেতা ইউজিন নকরেক জানান, বন আলুকে গারোরা থামান্দি বা বুনো আলু বলে। কন্দজাতীয় এ আলু প্রাকৃতিকভাবে গজায়। খুবই পুষ্টিকর। সিদ্ধ করে খেতে হয়। বনবাসীদের এই বুনো খাবার অভাব তাড়িত বাঙালিরাও এখন সংগ্রহ করছে। গারোদের নবান্ন উত্সবের উপাচার এটি। কিন্তু উজাড় বন ভূমিতে বিদেশি বৃক্ষ চারায় বনায়ন করায় বন আলুর মতো চিরায়ত প্রাকৃতিক খাবারের ভান্ডার বিলীন হচ্ছে। আচিকমিচিক সোসাইটির পরিচালক সুলেখা ম্রং জানান, দরিদ ও বেকার গারোরা ত্রাণ পাচ্ছে না। খাবারের সন্ধানে ছুটছে বনে। প্রাকৃতিক বন বিনাশের দরুন সহজে মিলছে না বুনো খাবার। দোখলা ফরেস্ট রেঞ্জার আব্দুল আহাদ জানান, বন আলু সংগ্রহে অনেকেই বনে ভিড় করছেন। বেড়িবাইদ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার তুষার রেমা জানান, চিত্রটা ভয়াবহ। অপ্রতুল সরকারি ত্রাণে কিছুই হচ্ছে না। পেটের জ্বালায় বুনো খাদ্যের সন্ধানে জঙ্গল চষে বেড়াচ্ছে অভাবীরা। মধুপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রাজীব রানা জানান, এপর্যন্ত সাড়ে পাঁচ হাজার পরিবারের মধ্যে ৫৫ টন চাল ও ১ লাখ টাকার খাদ্যসমাগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। আরো ২০ টন চাল এবং সোয়া ২ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। মধুপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফা জহুরা অপ্রতুল ত্রাণের কথা স্বীকার করে জানান, পর্যায়ক্রমে সবার ঘরেই খাবার পৌঁছে দেয়া হবে।
