ত্রাণ চুরি ও সংক্রামক রোগ আইন প্রয়োগ

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২০, ২১:৩৮

সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় জানাইয়াছে, বিভিন্ন এলাকায় জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠিতেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হইয়াছে। প্রয়োজনে তাহাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হইবে। ভালো কথা। ইহা ‘সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮-তেও বলা আছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখিতেছি প্রশাসনের পক্ষ হইতে এই আইনের প্রয়োগ সর্বত্র সমান হইতেছে না। যদি ব্যক্তি, দলমতের ঊর্ধ্বে আইন সকলের জন্য সমান হইয়া থাকে, তাহা হইলে আইনের প্রয়োগ প্রশাসন কীভাবে করিবে তাহার দিকেও লক্ষ রাখা প্রয়োজন।

ভারতবর্ষে সংক্রামক রোগবিষয়ক আইন ‘এপিডেমিক ডিজিজ অ্যাক্ট, ১৮৯৭’ প্রথম চালু করিয়াছিল ব্রিটিশরা। শত বত্সর পার হইয়া গিয়াছে। স্বাধীন বাংলাদেশে অন্তত দুই বার সংক্রামক ব্যাধি আইন রহিতকরণ ও হেফাজত অধ্যাদেশ জারি করা হইয়াছিল যথাক্রমে ১৯৭৭ এবং ১৯৭৮ সালে। ইহার বহুকাল পর ‘সংক্রামক রোগ আইন, ২০১৮’ পাশ করে বর্তমান সরকার। এই আইনের ২৭ নম্বর ধারায় বলা হইয়াছে, ‘এই আইনের অধীন সংঘটিত কোনো অপরাধের অভিযোগ দায়ের, তদন্ত, বিচার ও আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির বিধানাবলি প্রযোজ্য হইবে।’ যদি তাহাই হইয়া থাকে, তবে বিভিন্ন অঞ্চলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এবং আদালতে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে হেরফের পরিলক্ষিত হইতেছে কেন। প্রধানমন্ত্রী বারবার বলিতেছেন কাহাকেও ছাড় নহে, দলীয় বিবেচনা নহে। কারণ প্রধানমন্ত্রীও উপলব্ধি করিয়াছেন, ইহা কোনো স্বাভাবিক দুর্যোগ নহে, ইহা রাজনৈতিক মুখ দেখাদেখির সময় নহে। প্রয়োজন সকলের জন্য সমান আইন, সমান সুবিধা।

আমরাও মনে করিতেছি, করোনা ভাইরাসের এই মহাদুর্যোগে কেবল সংক্রামক রোগ আইন সতেজ রাখিলেই চলিবে না, ইহা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অপরাধীদের বিরুদ্ধে নির্দ্বিধায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ করিতে হইবে। আর তাহা করিতে হইলে আইনেরও কিছু সংশোধনের প্রয়োজন রহিয়াছে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে রোগটি দ্রুত বিস্তার হইতে শুরু করিয়াছে। আমরা জানি না কতদিন, অথবা কতকাল ইহার নিষ্পেষণে থাকিতে হইবে। তাই সরকার ভাবিয়া দেখিতে পারে, একটি বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করিয়া আইনটিকে আরো একটু শক্তিশালী করা যায় কি না। কারণ এই আইনের ২৮ নম্বর ধারায় বলা আছে, ‘এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধসমূহ অ-আমলযোগ্য (নন-কগনিজাবল), জামিনযোগ্য (বেইলেবল), এবং আপসযোগ্য (কমপাইন্ডেবল) হইবে।’ আমরা জানি বর্তমান দেশের কিছু মানুষের অপরাধপ্রবণতা এতটাই বাড়ন্ত যে তাহারা অ-আমলযোগ্য কোনো অপরাধকেই অপরাধ বলিয়া মনে করেন না। এই সকল ব্যক্তির জামিনযোগ্য মামলার মতো অপরাধের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বিশেষ তত্পর হয় না। কারণ জামিন লইয়া আসিয়া তাহারা নানা ধরনের ডিসটার্বেন্স তৈরি করিতে পারে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব খাটাইবার প্রবণতা তো থাকেই। আজকে যাহারা ত্রাণ চুরির সঙ্গে জড়িত, দেশের জনগণ তাহাদের খুনির মতো অপরাধী বলিয়া মনে করিতেছে। জাতির এই ভয়ানক দুর্বিপাকে যাহারা চৌর্যবৃত্তিতে লিপ্ত হইয়াছে তাহাদের সভ্য সমাজে বসবাসের অধিকারই প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ তাহার অপরাধটি জামিনযোগ্য! ইহা কি অসংগতিপূর্ণ নহে?