বিশ্বে এই মুহূর্তে সবচাইতে কাঙ্ক্ষিত বস্তুটির নাম হইল কোভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন। এই রোগের একটি কার্যকরী টিকার জন্য সারা বিশ্বের মানুষ চাতকের মতো অপেক্ষায় রহিয়াছে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি কি এত সোজা ব্যাপার? আর ভ্যাকসিন যতদিন না আসিতেছে ততদিন কী করিয়া প্রতিহত করা হইবে করোনা ভাইরাসকে? আপাতত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্ট করিয়া জানাইয়াছে—প্রতিটি অঞ্চলকেই বেশি বেশি করিয়া করোনার টেস্ট করাইতে হইবে। যত বেশি ‘টেস্ট’ করা সম্ভব হইবে ততই কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হইবে। সামান্য উপসর্গ কিংবা একেবারে উপসর্গহীন মানুষের পরীক্ষা করিতে পারিলেই সংক্রমণের পরিষ্কার চিত্র মিলিবে। এই পরীক্ষার তালিকায় যাহারা সবচাইতে আগাইয়া রহিয়াছে, তাহারাই করোনার করাল গ্রাস হইতে নিজেদের রক্ষা করিবার পরবর্তী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিবার সুযোগ পাইতেছে। ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুযায়ী গতকাল সন্ধ্যা অবধি প্রতি লক্ষে সংযুক্ত আরব আমিরাত টেস্ট করিয়াছে ৭ হাজার ৭৫৫ জনের। দক্ষিণ কোরিয়া (১০৫৬), অস্ট্রেলিয়া (১৫৩৫), জার্মানি (২০৬২) প্রভৃতি দেশ করোনাকে মোকাবিলা করিতেছে সবচাইতে দক্ষতার সহিত। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রতি লক্ষে টেস্ট হইতেছে মাত্র ১২ জনের। যদিও টেস্টের হার সম্প্রতি কিছুটা বাড়ানো হইয়াছে। মনে রাখিতে হইবে, করোনা দাবানল নির্বাপণে বেশি বেশি টেস্টই আপাতত সর্বোত্তম পরীক্ষিত উপায়, অন্তত যতদিন ভ্যাকসিন না আসিতেছে। কিন্তু ভ্যাকসিন আসিতে আরো কতদিন লাগিতে পারে?
এই প্রশ্নে উত্তরে বলা যায়, করোনা ভাইরাসের মতো আরএনএ ভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরি খুব সহজ নহে। আর এমনও নহে, কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে এক ভ্যাকসিনেই সকল দেশে কাজ করিবে। এক জুতায় সকল পা ঢুকিবে, তাহা বলা যায় না। উহানের সি-ফুড মার্কেট হইতে প্রথম যেই করোনা ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করিয়াছিল, সেই ভাইরাসের সহিত বিশ্বের সকল অঞ্চলে বর্তমানে ছড়াইয়া পড়া করোনা ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে নানান ধরনের সূক্ষ্ম অমিল রহিয়াছে। বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, ভাইরাসটি যত সময় ধরিয়া যত মানুষের মধ্যে ছড়াইবে, তত তাহার মধ্যে মিউটেশন ঘটিবে। এখন বাংলাদেশে কোন কোন দেশ হইতে ভাইরাসটি আসিয়াছে এবং সকল ভাইরাসের জিনোটাইপ এক কি না, তদুপরি উহা আসিবার পর পরিবর্তিত হইয়া নূতন স্ট্রেইন তৈরি করিতেছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর কেবল বাংলাদেশকে নহে, খুঁজিতে হইবে করোনা ভাইরাস ছড়ানো সকল অঞ্চলকেই। এই সকল বিষয় অনুধাবনের জন্য বিজ্ঞানীরা করোনা ভাইরাসের আরো বেশি করিয়া জিনোম সিকোয়েন্সিং করিতেছেন। ইতিমধ্যে বিশ্বের বহু দেশ করোনা ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের তথ্য জমা করিতেছে ফ্লু ভাইরাসের ডেটাব্যাংকে। ফ্যামিলি ট্রির মতোই তৈরি হইয়াছে ভাইরাসের ফাইলোজেনি। এখন পর্যন্ত জমা পড়া সিকোয়েন্সের সংখ্যা প্রায় পৌনে ৮ হাজার, এই তথ্য ভ্যাকসিন তৈরির কাজে ব্যবহার করিতে পারিবে বিশ্বের যে কোনো দেশ।
ভ্যাকসিনের সবচাইতে জটিল অংশ হইল ইহার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা। ইহা নিশ্চিতভাবেই একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তবে সারা বিশ্ব যেইভাবে এই ভাইরাসটির ভ্যাকসিন তৈরিতে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছে, তাহাতে আশার আলো দেখিতে দোষ নাই। আশাই এখন এই করোনাসমুদ্রে একমাত্র খড়কুটো।
