করোনা ও ন্যাড়া

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২০, ২১:৪৩

চিররঞ্জন সরকার

দেশে একের পর এক গুজব রটছে করোনার প্রতিষেধক হিসেবে। কোথাও রাত জেগে থানকুনি পাতা খাওয়া হচ্ছে, কোথাও পানি পড়া, কোথাও আদা-লবণ মিশিয়ে গরম পানি, কোথাও রসুন, আবার কোথাও তুলসীপাতা। করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে এবার অনেক এলাকায় ন্যাড়া হওয়ার হুজুগ চলছে। করোনার এই দীর্ঘ ছুটির দিনগুলোতে শিশু, কিশোর, যুবক, বুড়ো সবাই মাথার দিকে নজর দিয়েছে। মাথা ন্যাড়া করার মধ্যে কী আছে নিজেরাও জানে না কেউ। তবে এক প্রকার শান্তি অনুভব করছে সবাই, এটা বোঝা যায়।

উহানের করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে চীনের বেইজিংসহ অন্য সব প্রদেশ থেকে চিকিত্সক ও নার্স সেখানে পাঠানোর আগে তাদের অনেকের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়েছিল। আক্রান্তদের চিকিত্সা দেওয়ার সময় যেন নিজেরা এ ভাইরাসে আক্রান্ত না হন, সেজন্য চিকিত্সক ও নার্সরা চুল ছোটো করে ফেলছিলেন। অনেকে ন্যাড়াও করেছিলেন। চীনে স্বাস্থ্যকর্মীদের ন্যাড়া হওয়ার পেছনে স্বাস্থ্যগত যুক্তি ছিল। তবে বাংলাদেশের ন্যাড়া হওয়ার পেছনে হুজুগই বেশি কাজ করছে।

করোনা সংক্রমণ রোধে বাংলাদেশে গত ২৫ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে সবাইকে বাসায় অবস্থান করতে বলা হয়। এই ঘরে থাকার দিনগুলোতে অনেককেই মাথা ন্যাড়া করতে দেখা গেছে। মাথার চুল ফেলে কেউ নীরবে বাসায় অবস্থান করছেন আবার অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ন্যাড়া মাথার ছবি পোস্ট করছেন। করোনা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে এ যেন এক নতুন কৌতুক!

আমাদের দেশের বাবা-মায়েরা অবশ্য শিশুদের পাতলা চুল ঘন হবে বলে কিছুদিন পরপরই তাদের চুল ফেলে দেন। এটা বেশ বড়ো বয়স পর্যন্ত চলে কারো কারো ক্ষেত্রে। যদিও বারবার ন্যাড়া করলেই যে ভালো চুল গজাবে এ কথার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আবার প্রচলিত আছে, মাথা ন্যাড়া করলে চুল পড়া কমে যায়। কিন্তু মাথা ন্যাড়া করলে অনেকে বিরূপ মন্তব্য করেন; মশকরা করতে ন্যাড়া মাথায় হাত বুলিয়ে বিরক্ত করাও অনেকের শখ। এসব কারণে অনেকে চাইলেও ন্যাড়া করতে পারেন না। তাই করোনার ছুটিতে মাথা ন্যাড়া করছেন।

অনেকে অবশ্য ন্যাড়াপক্ষে বেশ শক্ত যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন। তাদের মতে, সরকারি নির্দেশনায় এখন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো সেলুনগুলোও বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন সেলুনে যেতে না পারায় মাথায় চুল বেড়ে যাচ্ছে। গরমের এই সময়ে চুল বেড়ে গিয়ে মাথা চুলকাচ্ছে। তাই বাড়িতে বসেই মাথা ন্যাড়া করে ফেলছেন।

এখানে বলে রাখা ভালো যে, টেকো আর ন্যাড়া কিন্তু এক নয়। টেকো বা টাক একটি হচ্ছে চুল উঠে যাওয়া, আরেকটি হচ্ছে চুল ফেলে দেওয়া। একটি প্রাকৃতিক, আরেকটি কৃত্রিম। ন্যাড়ারা ইচ্ছে করলে চুল রাখতে পারেন। কিন্তু টেকোরা তা পারেন না। এখানেই ন্যাড়া ও টেকোদের মৌলিক তফাত।

বাংলা ভাষায় সাধারণত কেশহীন মস্তককে টাক বলা হয়। ভাতের অভাব হাভাত হলেও চুলের অভাব কেন হাচুল না হয়ে টাক হলো—অনেকে অবশ্য সে প্রশ্নও তোলেন। আমরা সেসব জটিল প্রশ্নে না গিয়ে টাকবিষয়ক কিছু সাধারণ আলোচনা সেরে নিতে পারি। কথায় আছে, টাকের সঙ্গে টাকার সম্পর্ক আছে, মানুষের টাক পড়লে সেটা নাকি ধনী হওয়ার লক্ষণ। টাকের সঙ্গে টাকার সম্পর্ক আছে বটে, তবে সেটা নেতিবাচক। এমন একজনকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে কিনা অল্প বয়সে চুল পড়ে যাচ্ছে অথচ সেটা ঠেকানোর জন্য কিছু একটা ওষুধ ব্যবহার করেনি। জলের মতো টাকা খরচ করে হলেও আলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, হারবাল, কেমিক্যাল—সব পথই চেষ্টা করে মানুষ সেই পতন রোধ করার জন্য। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে একসময় মাথার সব চুল মাথার মায়া কাটিয়ে ধরণির আকর্ষণে পতিত হয়। তখনই মানুষের পিতৃপ্রদত্ত নামের সঙ্গে কোজাক, টাক্কু, জাম্বু, স্টেডিয়াম—এই টাইপের টাইটেল যুক্ত হতে শুরু করে। যেটা রোধ করার সাধ্য কারোর থাকে না।

তবে এখন যুগ পালটেছে। চুল না থাকা এখন আর তেমন কোনো বড়ো সমস্যা নয়। হলিউডে তো টাকমাথা নায়কদের জয় জয়কার। ফুটবল, রাগবি, বাস্কেটবল খেলোয়াড়রাও ইদানীং মহাত্মা গান্ধী মার্কা টাক নিয়ে বাজিমাত করছে। এদেশেও কমবেশি ন্যাড়া মাথাকে আজকাল স্টাইল বলেই মানে লোকজন। দুনিয়ার তাবত্ বিদ্বান, বুদ্ধিমান ও ধনবান লোকের চাঁদিতে চুলের বড়োই হাহাকার। তাতে অবশ্য তাদের সোশ্যাল স্ট্যাটাস বা গুরুত্ব কিছু কমেনি! প্রাচীন ভারতীয় পণ্ডিত চাণক্য অবশ্য বলেছেন, যা যাচ্ছে তাকে যেতে দাও। মিছে ধরে রেখে লাভ কী! চাইলেও পারবে না। চাণক্য অবশ্য নিজেও একজন নামজাদা টেকো ছিলেন!

মাথায় চুল থাকা-না-থাকা নিয়ে আমাদের সমাজে নানা রকম দৃষ্টিভঙ্গি চালু রয়েছে। একদিকে চুলকে যেমন সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে আমাদের সভ্যতায়, সংস্কৃতিতে, সাহিত্যে যুগ যুগ ধরে দেখে আসা হয়েছে, তাকে রোমান্টিসাইজ ও নানাভাবে ফ্যান্টাসাইজ করা হয়েছে এবং কম চুল বেশি চুলের ভিত্তিতে মেয়েদের ওপর তাদের সৌন্দর্যের দায়ভার চাপানো হয়েছে। একটি টিপিকাল নন্দনতত্ত্ব তৈরি করা হয়েছে। তেমনই এই প্রথাগত দমনমূলক ও লিঙ্গবৈষম্যমূলক সৌন্দর্যচিন্তার বিরুদ্ধে আজকাল অনেক জায়গায় মেয়েরা প্রচার করছে ও জনগণের সামনে তুলে ধরছে ন্যাড়া মাথার সৌন্দর্যকে। এই পদক্ষেপ নিশ্চিতভাবেই বৈপ্ল­বিক।

চুল নিয়ে আদিখ্যেতা করার দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। বরং এই ভেবে খুশি থাকুন, আপসে আপনার কিছু মূল্যবান সময় বেঁচে যাচ্ছে। নগদ টাকাও। চুলের পরিচর্যা বাবদ আপনার খরচ কিন্তু বড়ো কম নয়। তেল-জেল-শ্যাম্পু কিনতে পয়সা লাগে। তাছাড়া টেরিকাটা চুলের জমানা এখন আর নেই। চাঁদিতে যা কিছু অবশিষ্ট আছে তা কামিয়ে ফেলে নিজেকে ব্র্যান্ডেড করে ফেলুন। ফ্যাশন ব্র্যান্ড।

অনেক দেশে ন্যাড়া হওয়াটা প্রতিবাদেরও ভাষা। অবশ্য এটাকে বলা হয়, ‘ন্যাড়া’ হওয়া। ন্যাড়া হওয়া মানে, ঠিক ন্যাড়া হওয়ার আগের মুহূর্ত অবধি সেই মানুষটির মাথায় চুল ছিল, মানে সেই মানুষটি আসলে নিজের সৌন্দর্যকে বাঁচিয়ে রাখতে বা প্রস্ফুটিত করে তুলতে চুল রাখাটা বেশি প্রয়োজনীয় বলে মনে করে। কিন্তু প্রতিবাদের স্বার্থে, মানুষের আন্দোলনের কারণে, সে যখন তার নান্দনিক বোধের সঙ্গে আপস করে চুল ত্যাগ করে ন্যাড়া হয়, তখন প্রমাণিত হয় সে মানুষটির কাছে ঐ প্রতিবাদ বা আন্দোলন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যে নিজস্বতা শুধু শারীরিক বিষয় নয়, যার সঙ্গে সুগভীরভাবে জড়িয়ে আছে মানসিক সংবেদন। ব্যক্তিমানুষের উপস্থিতি যখন প্রতিবাদ বা আন্দোলনে অপরিহার্য, তখন সেই ব্যক্তিমানুষ প্রদর্শিত করার মতো কিছু ত্যাগ করলে তার কাছে আন্দোলনের বা প্রতিবাদের গুরুত্ব কতটা সেটা বোঝা যায় অনেকাংশেই। এছাড়া কমবেশি চুল সব মানুষের মাথায়ই থাকবে—এটা আমাদের সাধারণ জ্ঞান। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে যখন একসঙ্গে অনেক জন মানুষ ন্যাড়া মাথায় প্রতিবাদে নামে, তখন তা বেশি করে দৃশ্যমান হয় এবং প্রতিবাদে একটি গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত মাত্রা যুক্ত হয়। অন্যদিকে মাথায় চুল ছিল মানে চুল আবার উঠবে, তাই একেবারে প্রতিবাদের স্বার্থে যদি নিজের কিছু ত্যাগ করতে হয়ও, একটি আন্দোলনের প্রতীক নির্মাণ করতে হয়, তাহলে ন্যাড়া হওয়াটা অপেক্ষাকৃত সহজতর মাধ্যম নয় কি!

পুনশ্চ :

মানুষের জন্য আন্দোলনে নেমে সারা জীবন মাথা ন্যাড়া করে রেখেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। ২০১৭ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরিফের পদত্যাগের দাবিতে একজন পিটিআই কর্মী মাথা ন্যাড়া করে রাস্তায় নেমেছিলেন। ম্যানিলায় একটি কোম্পানির শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে ২৪ জন শ্রমিক মাথা ন্যাড়া করে রাস্তায় নেমেছিলেন ২০১৭ সালের প্রথম দিকে। আবার সিঙ্গাপুরে শিশুদের ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ন্যাড়া কর্মসূচির আয়োজন করেছিল একটি সংগঠন। মোট ৬ হাজার ব্যক্তি মাথা ন্যাড়া হয়ে এই কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন ২০০৩ সালে।

২০২০ সালে আমাদের দেশেও এ ধরনের প্রতিবাদ কর্মসূচি লক্ষ করা গেছে।

করোনা ভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ত্রাণসহায়তা দিচ্ছে সরকার। কিন্তু অসহায়-দরিদ্রদের এই ত্রাণ আত্মসাতের খবর আসছে প্রতিনিয়ত। দেশের বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ আত্মসাতে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মাথা ন্যাড়া করেছেন হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের শতাধিক যুবক। গত ১০ এপ্রিল এই ন্যাড়া মাথার প্রতিবাদকারীদের ছবি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

আমাদের দেশে এখন আরামবোধ, সেলুনে যাওয়ার ঝামেলা এড়ানো, ঘরে থেকে সময় পার করার একঘেয়েমি দূর করতে ন্যাড়া হওয়ার মধ্যে আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে একশ্রেণির মানুষ। তবে এটা হতে পারত করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করার জাতীয় কর্মসূচি, যার স্লোগান হতে পারত, ‘আসুন ন্যাড়া হই, ঘরে থাকি, ভালো থাকি।’

তাহলে ঘরে ঘরে স্বেচ্ছায় যে ন্যাড়াকরণ কর্মসূচি চলছে, তা আরো অনেক ফলদায়ক হতো!

n লেখক :রম্যরচয়িতা