আলোকপাত
মো. রেজাউল করিম সবুজ
করোনা ভাইরাসের কারণে লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে সারাবিশ্ব। থমকে গেছে সব কার্যক্রম। পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ এখন ঘরবন্দি। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত্র ও মৃত্যুর সংখ্যা। তবে প্রাকৃতিক মহামারি পৃথিবীতে এই প্রথম নয়। এর আগেও এমন অনেক মহামারি দেখা গেছে। যাতে অনেক নগর সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রাচীন রোমে ১৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ১৫ বছরে গুটি বসন্তের কারণে জনমানব শূন্য হয়ে যায়। সেই সময় রোমকে বলা হতো ভূতের নগরী। শহরে বাতি প্রজ্বলনের জন্য কোনো লোক পাওয়া যেত না। প্লেগ মহামারিতে ১৭২০ সালে পৃথিবীতে মৃত্যুবরণ করে প্রায় ২০ কোটি মানুষ, ভারত ও পূর্ব এশিয়ায় কলেরা মহামারিতে ১৮২০ সালে লাখ লাখ লোক মারা যায়। ১৯২০ সালে পৃথিবীতে মহামারি হিসেবে নেমে আসে বসন্ত রোগ, এতে প্রায় ৫ কোটি লোক মারা যায়। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরের বাসিন্দা ওয়েন গুইশিয়ান (৬৭)-এর শরীরে ধরা পড়ে নভেল করোনা ভাইরাস; যা বৈশ্বিক মহামারিতে পরিণত হয়েছে। এরইমধ্যে বিশ্বের ২০৫টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাস। আক্রান্তের সংখ্যা ২০ লাখ পেরিয়ে গেছে, আর মৃত্যু হয়েছে ১ লাখের বেশি মানুষের। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বর্তমানে ১ হাজার ৮৩৮ জন এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ৭৫ জন। সরকার ভাইরাসটি মোকাবিলায় নানমুখী পদক্ষেপ নিলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন বাংলাদেশে এ মাসে ভাইরাসটি কঠিন রূপ নিতে পারে। গত কয়েক দিনে আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে আক্রান্তের সংখ্যা। ইতোমধ্যে সরকার বাড়তি সর্তকতায় শহরে প্রবেশ ও বের হওয়া বন্ধ করেছে। তবু নানা ছলাকলায় যাতায়াত করছে মানুষ। ভাইরাসটি মোকাবিলায় ঢাকায় অঘোষিত লকডাউন চললেও বিভিন্ন জেলা শহরে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। করোনার কারণে পৃথিবীর সব সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি হুমকির মুখে। প্রতিটি দেশ নিজেদের অর্থনীতি চাঙা রাখার চেষ্টা করছে। করোনার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও প্রভাব পড়ছে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারও ৭২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। কিন্তু এর সঠিক বাস্তবায়ন হবে কী? এমন প্রশ্ন অনেকেরই মনে ঘুরছে। তবে সরকারঘোষিত প্যাকেজটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতি অনেকটাই স্বাভাবিক হবে। এছাড়া বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের করোনা মোকাবিলায় গঠিত কমিটির মধ্যেও কোনো সামঞ্জস্যতা নেই। ফলে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যার মাসুল গুণতে সময় লাগবে না জনবসতিপূর্ণ এই দেশটির। যদি ইতালি-স্পেনের মতো অবস্থা তৈরি হয়; তবে তা মোকাবিলা বাংলাদেশের মতো একটি দেশের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারের নির্দেশিত বার্তা অনুযায়ী সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে যার যার অবস্থান থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী কোভিড-১৯ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে বেশির ভাগ মানুষই অসচেতনতার পরিচয় দিচ্ছে। এখনো অনেকেই কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশনের বিষয়ে জানে না। তাদের কাছে আইসোলেশন ভয়ানক কিছু। ফলে হাসপাতাল থেকে পালাচ্ছে তারা। অনেকে ভয়েই রোগটি লুকিয়ে রাখছেন, আবার অনেকে লক্ষণ লুকিয়ে চিকিত্সা নিতে গিয়ে অনেককে আক্রান্ত করছেন। ফলে রোগটি মহামারি আকারে রূপ নিতে সুবিধা পাচ্ছে। অথচ এ সময় আমাদের সচেতনতাই এই মহামারি রোগটি থেকে মুক্ত রাখতে পারে। রোগটির একমাত্র ওষুধ আমাদের সচেতনতা। এমন পরিস্থিতিতে এ সব মানুষকে করোনা এবং করোনার চিকিত্সা বিষয়ে আরো বেশি সচেতন করতে হবে। আমাদের সচেতনতাই পারে আমাদের দেশকে, পৃথিবীটাকে রক্ষা করতে।
n লেখক :সেকশন অফিসার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
