নাজমুন্নাহার নিপা
আমাদের দেশীয় কৃষির অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ যেমন সার, বীজ, বালাইনাশক অনেক হারে আমদানিনির্ভর। বিশ্বব্যাপী চলমান এই সংকটের জন্য কৃষকদের কাঙ্ক্ষিত কাঁচামালের ঘাটতি হতে পারে। যার ফলে উত্পাদন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, বর্তমান বিশ্বের ৮২০ মিলিয়ন মানুষ দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধায় ভুগছে; সাধারণ জীবনযাপনের জন্য যে পরিমাণ ক্যালরি দরকার তা পাচ্ছে না। এর মধ্যে ১১৩ মিলিয়ন মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি। ক্ষুধা এতটাই মারাত্মক যে এটি জীবন ও জীবিকার জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেখানে কোভিড-১৯ একটি বড়ো বাধা।
লাখ লাখ বাচ্চা যে স্কুল-খাবারের ওপর ভরসা করে চলেছে, তাদের অনেকেরই স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে এফএও-সমর্থিত স্কুলগুলোতে যে খাবার দেওয়া হয় তা ৮৫ মিলিয়ন বাচ্চার উপকারে আসে। মহামারিজনিত কারণে স্কুলভোজ কর্মসূচি স্থগিত হওয়ায় দুর্বল শিশুদের খাদ্য সুরক্ষা এবং পুষ্টি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, যা রোগের সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতাও তাদের দুর্বল করে দেয়।
নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে বিশেষ করে এটি বেশি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন গবেষকরা। তাঁরা বলছেন মাঠ পর্যায়ে কর্মীদের সংকটে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে বিপুল হারে। অন্যদিকে উচ্চবিত্তরা একসঙ্গে অনেক খাবার কিনে মজুদ করে রেখে দিচ্ছেন। মূলত করোনা ভাইরাসের জন্য আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ায় এমনটি হয়েছে। এর ফলে যারা দিন এনে দিন খায় তাদের জন্য পরবর্তী সময়ে খাবার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
কোভিড ১৯-এ কৃষক ও মত্স্য ব্যবসায়ীদের অনেক ক্ষতি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জমিতে কাজ করা, পশুপাখির যত্ন নেওয়া বা মাছ ধরায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে এটি। বাজারে তাদের পণ্য বিক্রি করতে বা প্রয়োজনীয় পণ্যগুলো কিনতে বা উচ্চতর খাদ্যমূল্য এবং সীমিত ক্রয়ক্ষমতার কারণে তাদের সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। দিনমজুররা ফসল কাটা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের চাকরি ও আয়ের দিক দিয়ে খুব ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কৃষির পাশাপাশি অন্যান্য খাতেও করোনা রোগের প্রভাব প্রত্যাশিত। যেমন মাছ ৩ বিলিয়ন মানুষের জন্য মাথাপিছু প্রোটিন গ্রহণের গড় ২০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করে, কম উন্নত দেশগুলোতে ৫০ শতাংশেরও বেশি এবং এটি একটি বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক ব্যবসায়িক মাধ্যম। যে দেশগুলো মাছ ধরা খাতের ওপর বেশি নির্ভরশীল—সেই দেশগুলোতে জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকা, খাদ্য সুরক্ষা, পুষ্টি এবং বাণিজ্য খাতে করোনা বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিবহন বিশেষত তাজা খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলার জন্য বাধাজনক এবং এর ফলে খাদ্য ক্ষতির পরিমাণ এবং বর্জ্য বাড়ার কারণও হতে পারে। টাটকা মাছ এবং জলজ পণ্য, যা নষ্ট হয় এবং তা বিক্রি, প্রক্রিয়াজাতকরণ বা সংরক্ষণ করা বিশেষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। শ্রমের অভাব খাদ্য উত্পাদন ও প্রক্রিয়াকরণ ব্যাহত করতে পারে, বিশেষত শ্রমনির্ভর শিল্পের জন্য। উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশেষত ঝুঁকিতে রয়েছে কারণ কোভিড-১৯ শ্রমশক্তি হ্রাস করতে পারে, তাছাড়া আয় এবং জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি শ্রমনির্ভর ফার্মে উত্পাদনকে (কৃষি, মত্স্য) প্রভাবিত করতে পারে।
এক্ষেত্রে জরুরি খাদ্য চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করা, পুষ্টিহীনতা প্রতিরোধ ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি প্রসার, সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোতে খাদ্য বিতরণ, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য প্রাথমিক খাবারের ওপর কর থেকে ছাড় দেওয়া ইত্যাদি। খাদ্য ঘাটতি এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। আমাদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে কোভিড-১৯ যেন আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অনিয়ন্ত্রিত সংকট সৃষ্টি না করে এবং ক্ষুধা ও অপুষ্টি বাড়িয়ে না তোলে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
