বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি রাষ্ট্র এখন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। কোথাও সংখ্যায় কম, কোথাও সংখ্যাটা ইতোমধ্যেই আতঙ্কিত করিয়া তুলিয়াছে; কিন্তু সবগুলি দেশের সামনেই অস্তিত্ব টিকাইয়া রাখিতে লকডাউন এবং সামাজিক দূরত্ব বাধ্যতামূলক হইয়া উঠিয়াছে। আর ইহার মাঝে কোনো রাষ্ট্রই শখের বশবর্তী হইয়া লকডাউন করে নাই। প্রায় প্রত্যেক দেশের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড স্তব্ধ হইয়া গিয়াছে, প্রতিদিন কোটি কোটি ডলার গচ্ছা দিতে হইতেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলি অর্থনীতির কথা বিবেচনা করিয়া অস্থির হইয়া উঠিয়াছে; কিন্তু তাহার পরও জনগণকে ঘর হইতে বাহির হইবার আদেশ দিতে পারিতেছে না। তবে ভাইরাস তো আর অর্থনৈতিক অবস্থার দিকে তাকাইয়া প্রবেশ করে নাই। উহার পরিণতি সকল দেশের জন্যই সমান। ফলে এইরূপ লকডাউন সমানভাবে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলিকেও মানিয়া চলিতে হইতেছে।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, অধিকাংশ দরিদ্র দেশেই জনগণ সঠিকভাবে সরকারের আদেশ-নির্দেশ মানিতেছে না, যদিও এই আদেশ জনগণের কল্যাণেই। ফলে একদিকে যেমন দেশগুলিকে অর্থনৈতিক লোকসান গুণিতে হইতেছে, অন্যদিকে ভাইরাস ঠেকাইবার কাজটিও ব্যর্থ হইতেছে। আর সেই কারণেই বহু দেশ অতিরিক্ত কঠোর হইতে বাধ্য হইতেছে। ফিলিপিনসের প্রেসিডেন্ট দুতার্তে জনগণের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়া শনিবার বলিয়াছেন—লকডাউন না মানিলে অচিরেই সামরিক আইনের আদলে সেনাবাহিনী নামানো হইবে—এখন আপনারাই বাছিয়া লইবেন কী করিবেন। ইতোমধ্যে আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ায় পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লকডাউন উপেক্ষা করায় ১৮ জনকে গুলি করিয়া হত্যা করিয়াছে। আমরা অবশ্যই এইরূপ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বাংলাদেশে চাহি না; কিন্তু লকডাউনের গুরুত্ব জনগণের বুঝিতে হইবে। তাহা না হইলে কঠোর হইবার কোনো বিকল্প থাকিবে না। সত্যি কথা বলিতে কি, আমাদের নাগরিক সতেচনতা এমনিতেই কম। আমরা বহু ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করি, আইন না মানার প্রবণতা সর্বক্ষেত্রে রহিয়াছে। তবে সাধারণ সময়ের কথা ভিন্ন। এখন এমন একটি জরুরি সময় যে, একজন আইন না মানিয়া অবাধে ঘোরাঘুরি করিলে তাহা আরেক জনের মৃত্যুর কারণ হইতে পারে। সুতরাং সরকারেরও এই স্পর্শকাতর সময় বুঝিতে হইবে, কখনো কখনো ভালোবাসা দিয়া শাসন হয় না। প্রয়োজনে কঠোর হইয়া আইন মানিতে বাধ্য করা প্রয়োজন হইয়া পড়ে। সরকার প্রধান এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহেই জনগণকে সতর্ক করিয়াছেন। ইহার পর প্রতিনিয়ত তিনি নির্দেশ মান্য করিতে, চুরিচামারি না করিতে বলিয়া আসিতেছেন; কিন্তু মানুষ পরিস্থিতি অনুধাবন করিতে চাহিতেছে না। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শনিবার হইতে কঠোর ভাবাপন্ন হইয়াছে, তথাপি উহা যথেষ্ট বলিয়া মনে হইতেছে না। আমরা মনে করি, প্রয়োজনে আরো কঠোর হইয়া আদেশ মান্য করিতে বাধ্য করিতে হইবে, যাতে এই দুঃসময়েই আমাদের মধ্যে আদেশ মান্য করিবার শিক্ষা খানিকটা হইলেও তৈরি হয়।
