দশ দিগন্তে g আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
আমি আওয়ামী লীগের অনেক মন্ত্রী এবং অধিকাংশ এমপিকেই পছন্দ করি না। এবং তারাও যে আমাকে পছন্দ করেন তা নয়। কিন্তু কোভিড-১৯-এর এই কেয়ামত তুল্য দুর্যোগের সময় আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকায় অনেক স্বস্তিবোধ করছি। কেন স্বস্তিবোধ করছি সে কথাটাই এখানে লিখছি। চার্চিলের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী স্যার স্টাফোর্ড ক্রিপস বলেছেন, ‘হিটলারের অভিযানের সময় চার্চিল ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী না থাকলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ব্রিটেনের অবস্থা কী দাঁড়াতো তা সহজেই অনুমেয়।’
বাংলা ১৩৫০ সালে অবিভক্ত বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় কংগ্রেস নেতা শরত্চন্দ্র বসু (নেতাজী সুভাষ বসুর বড় ভাই) বলেছিলেন, ‘থ্যাস্কস গড্ এ সময় ফুড আন্ড সিভিল সাপ্লাইয়ের মন্ত্রী পদে শহীদ সোহরাওয়ার্দী আছেন। তার সাহস ও দক্ষতা আছে। দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির চক্রান্ত রোধে তার দৃঢ়তা রয়েছে’ দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির চক্রান্ত বলতে শরত্ বসু বুঝিয়েছিলেন, এই চক্রান্ত ছিল ব্রিটিশ সরকারের—বিশেষ করে তখনকার প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের।
পরবর্তীকালে প্রকাশ পেয়ে যায়, জাপানিরা সারা বাংলাদেশ দখল করে নেবে এবং দেশটির বিশাল খাদ্যশস্য তাদের হাতে চলে যাবে এই ভয়ে চার্চিল নির্দেশ দেন, সব চাউল গোপন গুদামে লুকিয়ে ফেলার জন্য। খোলা বাজারে যে সামান্য চাউল থেকে যায় অসাধু ব্যবসায়ী তা লুকিয়ে ফেলে এবং চাউলের দাম ৫ টাকা মণ থেকে ৫০ টাকায় উঠে যায়। মহাদুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তাতে অবিভক্ত বাংলাদেশে ৫০ লাখ নরনারীর মৃত্যু ঘটে।
এ সময় অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লীগ সরকার ছিল ক্ষমতায়। শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ছিলেন খাদ্য ও অসামরিক সরবরাহ মন্ত্রী। তিনি ভারতের অন্যান্য প্রদেশ এবং বার্মা (বর্তমানের মিয়ানমার) থেকে চাউল এনে এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চালান। কিন্তু এই আমদানিকৃত চাউলের পরিমাণ ছিল প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। তিনি বুঝতে পারেন, তার মাথার উপরে যে বিদেশি সরকার রয়েছে, তারা দুর্ভিক্ষরোধে তার সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিচ্ছে। অবিভক্ত বাংলার তত্কালীন গভর্নর স্যার জন হার্বাটের সঙ্গে তার বিরোধ বাধে। বাংলাদেশে খাদ্যাভাবের সুযোগ নিয়ে যে অসাধু খাদ্য ব্যবসায়ীরা মুনাফা লুটছিল, তাদের ব্যবসায়ের পার্টনার ছিলেন ব্রিটিশ গভর্নর হার্বাটও।
তত্কালীন মিডিয়া ছিল কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা কর্তৃক প্রভাবিত। তারা প্রচার শুরু করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইচ্ছাকৃতভাবে অসাধু খাদ্য ব্যবসায়ীদের সাহায্য করার জন্য এই দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেছেন (এই প্রচারণা এখনো আছে)। দিল্লিতে নিযুক্ত ব্রিটিশ বড়ো লাট, লর্ড ওয়াভেলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য স্যার জওলা প্রসাদ শ্রী বাস্তব এই খাদ্যাভাব সম্পর্কে তদন্ত শুরু করেন। তিনি এই ষড়যন্ত্রের জাল ধরতে পারেন এবং বলেন, ‘এই দুর্ভিক্ষ মনুষ্য সৃষ্ট।’ নাটের গুরু স্যার জন হার্বাটকে লন্ডনে তলব করা হয়। হার্বাট লন্ডনে না গিয়ে কলকাতাতেই আত্মহত্যা করেন। কংগ্রেস নেতা কিরণ শঙ্কর সেনগুপ্ত বলেন, (তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদেরও সদস্য ছিলেন) শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী এই সময় খাদ্যমন্ত্রী না থাকলে দুর্ভিক্ষে আরো ৫০ লাখ লোকের মৃত্যু হতো। শহীদ সাহেব অনেক গোপন সরকারি গুদামে লুকানো চাউল নিজ দায়িত্বে বাজারে ছেড়ে দেন এবং অভাবী মানুষের জন্য সারা প্রদেশে লঙ্গরখানা খোলার নির্দেশ দেন।
একই ঘটনা ঘটেছে স্বাধীন বাংলাদেশে, ১৯৭৪ সালের এই সময়ে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষ কিছুটা প্রকৃতি সৃষ্ট এবং কিছুটা মনুষ্য সৃষ্ট। দেশে ভয়াবহ দীর্ঘ স্থায়ী প্লাবন দেখা দেয় এবং খেতের ৮০ শতাংশ শস্য নষ্ট হয় মুজিব সরকার এই মহাপ্লাবনের এবং খাদ্যাভাবের আভাস আগেই পেয়েছিলেন। সে জন্য আমেরিকার নিকসন সরকারের সঙ্গে এক খাদ্যচুক্তি করে ওই বছরের নভেম্বর মাসের আগেই দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য আমদানির ব্যবস্থা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের। বাংলা ১৩৫০ সালের দুর্ভিক্ষ ঘটিয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকার। ইংরেজি ১৯৭০ সালে সেই একই দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির যড়যন্ত্র থাকায় সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন সরকার যথা সময়ে খাদ্যবাহী জাহাজগুলো বাংলাদেশে না পাঠিয়ে ‘হাই সিতে’ আটকে রেখে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির ব্যবস্থা করে। চার্চিলের মতো এক্ষেত্রে নাটের গুরু ছিলেন মানবতার এক চিহ্নিত শত্রু হেনরি কিসিঞ্জার। তখন তিনি ছিলেন আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মার্কিন কূটনীতি পরাস্ত করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এটাই তার মনের রাগ এবং উদ্দেশ্য ছিল দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে মুজিব সরকারের জনপ্রিয়তা ধ্বংস করা এবং ঐ সরকারের পতন ঘটানো।
মুজিব সরকার অসাধারণ সাহস ও দক্ষতার সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সূত্র এবং মিয়ানমার ও ভারত থেকে চাল ও গম এনে খাদ্যাভাব ঠেকাবার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু প্রকৃতি ছিল সরকারের প্রতিকূল। দেশের নিম্নাঞ্চলগুলো এমনভাবে প্লাবিত হয়েছিল যে খাদ্যবাহী কোনো হেলিকপ্টার কোথাও নামতে পারেনি। হেলিকপ্টার থেকে প্লাবিত অঞ্চলে খাদ্য নিক্ষেপ করা হয়। তা স্রোতে ভেসে গেছে। অধিকাংশ সময় জনগণের কাছে পৌঁছতে পারেনি। তবু সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন।
এই জাতীয় দুর্যোগে একাত্তরের পরাজিত শত্রুরা হাত মেলায় চীনপন্থি বামদের সঙ্গে এবং প্রচার শুরু করে শেখ মুজিব দেশে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে দেশের মানুষ মেরেছেন। কত মানুষ মরেছে তা নিয়ে এই দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সাবেক জামায়াত ও মুসলিম লীগপন্থিরা প্রচার করে এই দুর্ভিক্ষে ২ লাখ লোকের মৃত্যু হয়েছে। তখনকার চীনপন্থি বামেরা সংখ্যা আরো বাড়াতে থাকে। তখনকার চীনপন্থিদের এক জন নেতা হায়দার খান রনো (বর্তমানে সিপিবিতে নাম লিখিয়েছেন) দাবি করেন, ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষে ৩ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এই দাবির সঙ্গে তাল মিলিয়েছিল আমাদের সুশীল সমাজেরও অনেকে। সদ্য স্বাধীন দেশ, তার সামনে একটি জাতীয় দুর্যোগ, এই সময়েও দেশের ডান ও বাম দুদিকেরই প্রভাবশালী নেতাদের সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে হাত মেলাতে দেখা গেছে। এখন চীন বাংলাদেশের বন্ধু। ফলে চীনপন্থি বলেও কেউ নেই। কিন্তু তাদের প্রোপাগান্ডাটা রয়েছে। শেখ মুজিব ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ ঘটিয়ে লক্ষাধিক নরনারীকে না খাইয়ে মেরেছেন। মার্কিন ম্যাগাজিন ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্সে’ আমেরিকা কীভাবে এই দুর্ভিক্ষ ঘটিয়েছিল তার বিবরণ (food as wepon) ছাপা হওয়ার পর আমাদের ‘হলিউডি সুশীল সমাজের’ প্রচারণা বন্ধ হয়।
তার পরও মহাপ্লাবন এসেছিল বাংলায়। তখন শেখ হাসিনা ক্ষমতায়। তখনো এই মহাপ্লাবনকে কেন্দ্র করে দেশের শত্রুদের চক্রান্ত শুরু হয়েছিল। বিবিসিকে দিয়ে বলানো হয়েছিল, এই প্লাবনে এবং তত্পরবর্তী দুর্ভিক্ষে ২ লাখ লোকের মৃত্যু হবে। শেখ হাসিনা অদ্ভুত দক্ষতায় বাইরের সাহায্যের জন্য অপেক্ষা না করে কেবল জনগণকে পারস্পরিক সাহায্যে উদ্যোগী করে নিজেও হাতে রুটি বানিয়ে প্লাবনে অবরুদ্ধ শহরের মানুষের মধ্যে বিতরণ করে এক জন মানুষকেও না খেয়ে মরতে দেননি।
তার পরও শেখ হাসিনার লৌহ কঠিন চরিত্র দেখেছি বিডিআর বিদ্রোহের সময়, আড়াই তিন বছরব্যাপী বিএনপি জামায়াতের বিভীষিকাময় সন্ত্রাসের মোকাবিলা করার সময়। দেখেছি ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার মুখে ঝাঁসির রানির মতো অগ্নিকন্যা হয়ে দাঁড়াবার সময়। তার ইস্পাত কটিন মনের তেজ ও দুঃসাহস দেখেছি ’৭১-এর দালাল ও ঘাতকদের ফাঁসি কাষ্ঠে চড়ানোর সময়। এজন্যই একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন মাত্র হি (He) আছেন, তিনি শেখ হাসিনা আর সবাই শী (She)’।
এখন বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের করাল গ্রাস যখন বাংলাদেশকেও ধরে ফেলেছে তখন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকায় শুধু আমি নই, দেশের অনেক মানুষ স্বস্তিতে আছেন। তারা সবাই জানেন, আছে মৃত্যু আছে দুঃখ, তবু তাকে সাহসের সঙ্গে মোকাবিলার জন্য এমন একজন নেতা আছেন, যিনি বহু দুর্যোগে অটল থাকার একজন পরীক্ষিত মানুষ।
পীড়িত জনগণের মনোবল অটুট রাখার জন্য শেখ হাসিনার প্রায় প্রাত্যহিক ভিডিও কনফারেন্সের বক্তব্য আমি শুনি। তিনি করোনা পরবর্তী যে আরো ভয়াবহ বিপর্যয় বিশ্ব এবং বাংলাদেশের জন্যও অপেক্ষা করছে, সে সম্পর্কে আগেভাগেই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন এবং বলেছেন, সামনে রয়েছে অর্থনৈতিক মন্দা ও দুর্ভিক্ষ। এ সম্পর্কে তার সরকারের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রস্তুতির কথাও ঘোষণা করেছেন।
জাতীয় দুর্যোগ কখনো কোনো সরকার একা সামলাতে পারে না। এজন্য অটুট জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। তাহলে বাংলাদেশ আগামী সংকটগুলোও মোকাবিলা করতে পারবে। দুর্ভাগ্যক্রমে এই জাতীয় ঐক্য এই মুহূর্তে আমাদের নেই। জনগণের এক বিশাল অসতর্ক ও বিধি-নিষেধ না মেনে চলা উচ্ছৃংখল অংশ একটি দুর্বল, অসংগঠিত ক্ষমতাসীন দল, এক বিরাটসংখ্যক অসাধু মন্ত্রী, এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান দুর্নীতিবাজ আমলাতন্ত্র এই সব নিয়ে শেখ হাসিনাকে এক বিশ্বদানবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হয়েছে। তার হাতে উন্নত দেশগুলোর মতো এই দানবকে রোখার ডাক্তার, ওষুধ, যন্ত্রপাতিও নেই। কিন্তু সীমিত সমর্থ নিয়েই শেখ হাসিনা যুদ্ধে নেমেছেন। দেশের একটি চরিত্র ভ্রষ্ট সুশীল সমাজও এখন শেখ হাসিনার পাশে নেই। এরা পারলে একাত্তর সালের ও পঁচাত্তর সালের মতো অক্সফোর্ডে ও হার্ভার্ডে পালাতেন। কিন্তু অক্সফোর্ডে ও হার্ভার্ডও এখন মহামরণ ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত। তারা পালাবেন কোথায়? তাই ঘরে বসে আল্লার নাম জঁপছেন।
উন্নত অনুন্নত সব দেশকেই এবার ব্যাংক ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বাঁচাতে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াতে হবে বাংলাদেশকে। ফলে সর্বত্র মুদ্রাস্ফীতি অনিবার্য। এই মুদ্রাস্ফীতি রোধ করার জন্য উত্পাদন বাড়ানো ও সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। প্রশ্ন দুর্নীতি পরায়ণ একশ্রেণির জনপ্রতিনিধি ও দুর্নীতিপরায়ন আমলাতন্ত্র দ্বারা তা করা যাবে কি না! ৭২ সালে তাজউদ্দীন আহমদ অর্থমন্ত্রী থাকাকালে যুদ্ধবিধস্ত অর্থনীতি চাঙ্গা করার জন্য উত্পাদনবিহীন দেশে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার নোট ছেপে বাজারে ছেড়ে ছিলেন। ফলে রাতারাতি ঢাকায় রিকশাভাড়া চার আনা থেকে চার টাকায় এবং চার টাকা কেজি চালের দর চারশ টাকায় উঠেছিল। এই ভুল যেন আমরা আবার না করি। শেখ হাসিনাকে এবারেও ভাঙা তরির মাটি হয়ে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিতে হবে। জোয়ান অব আর্ক তখনকার উত্তাল ইংলিশ চ্যানেল কাঠের বোটে পাড়ি দিয়ে তীরে পৌঁছে ছিলেন। শেখ হানিসাকেও তার ভাঙা নৌকা নিয়ে আবারও উত্তাল মৃত্যুসাগর পাড়ি দিয়ে তীরে পৌঁছাতে হবে।
আছে মৃত্যু আছে দুঃখ, কিন্তু সামনে অবশ্যই আছে ঘনকালো মেঘের আড়ালে জীবনের অপেক্ষমাণ সূর্যোদয়।
[লন্ডন, ১৮ এপ্রিল, শনিবার, ২০২০]
