মৃত্যুপুরী যুক্তরাষ্ট্র তবুও লকডাউনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২০, ০০:২৫

বিশ্বে মহামারি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। গতকাল পর্যন্ত ৩৮ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। আক্রান্ত হয়েছে ৭ লাখের বেশি মানুষ। বিশ্বে মৃত্যুর প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং আক্রান্তের এক-তৃতীয়াংশই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেশে। দেশটি যেন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সেই দেশেই কিনা লকডাউনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হচ্ছে। আর সেই বিক্ষোভে সমর্থন দিয়েছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বিক্ষোভকারীরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। সোমবার থেকে লকডাউন শিথিলের ঘোষণা দিয়েছে ভারতও। এদিকে স্পেনে গতকাল মৃত্যু ২০ হাজার ছাড়িয়েছে।

তার পরও যুক্তরাষ্ট্রে লকডাউনবিরোধী বিক্ষোভ

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগেই লকডাউন শিথিল করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার কথা বলেছেন। তিনি সবকিছু খুলতে তিনটি ধাপের কথা বলেছেন। ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে গতকাল রাত ১২ টা পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ২৩ লাখ ৬ হাজার ৬৩৯ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৬ জনের। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রেই মারা গেছে ৩৮ হাজার ২০০ জন। শনিবার দেশটিতে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে এক দিনে আড়াই হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।

নিউ ইয়র্কেই প্রাণ গেছে ১৭ হাজারের বেশি মানুষের। মার্কিন বিশেষজ্ঞরা ১ থেকে ২ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন। কিন্তু তারপরও দেশটিতে সবকিছু বিশেষ করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবিতে বিভিন্ন রাজ্যে কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভ চলছে। কিছু রাজ্য ইতিমধ্যে একত্র হয়েছে সবকিছু খুলে দেওয়ার জন্য। মিশিগান, নর্থ ক্যারোলিনা, ওহাইও, উটাহ, উইওমিং, নিউ ইয়র্ক, ভার্জিনিয়া ও মিনেসোটায় বিক্ষোভ চলছে। বিভিন্ন রাজ্যের বিক্ষোভে শত শত লোককে অংশ নিতে দেখা যায়। বিক্ষোভকারীরা লকডাউনকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে উল্লেখ করেছেন। লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব উপেক্ষা করেই তারা বিক্ষোভে নামছেন। এমনকি বিভিন্ন সমুদ্রসৈকতেও মানুষের ভিড় লক্ষ করা গেছে।

বিক্ষোভকারীদের হাতে প্ল্যাকার্ড দেখা গেছে। সেখানে লেখা আছে—‘কোভিড-১৯ একটি মিথ্যা বিষয়, বাস্তবতাকে ভয় করা যাবে না, প্রত্যেক ব্যবসাই গুরুত্বপূর্ণ, মানুষ কাজ চায়, একটা ভুয়া সংকট, সুইডেনের মতো হতে হবে, লকডাউনের সিদ্ধান্ত ভুল’ ইত্যাদি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিক্ষোভে সমর্থন দেওয়ায় গভর্নররা বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট গভর্নররা নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বর্তমান পরিস্থিতিকে অবজ্ঞা না করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিভিন্ন রাজ্যের গভর্নররা বলছেন, তাদের রাজ্যে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, সেগুলো কখন তুলে নেওয়া হবে সেটা তাদের সিদ্ধান্ত।

ট্রাম্প এ ব্যাপারে সব কর্তৃত্ব এককভাবে নিজের হাতে নিতে চান বলে এক টুইটে যে দাবি করেছিলেন তার জবাবে পেনসিলভানিয়া রাজ্যের গভর্নর টম উলফ বলেন, আমার রাজ্যে সবকিছু বন্ধ করা হয়েছে যেভাবে আমাদের প্রশাসনিক দায়িত্বে, সেভাবে সবকিছু খোলার প্রাথমিক দায়িত্ব আমাদেরই। ওয়াশিংটন রাজ্যের গভর্নর জে ইনস্লি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলে বিক্ষোভে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন। নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সি, রোড আইল্যান্ড, কানেকটিকাট, ডেলাওয়্যার, ম্যাসাচুসেটস্ এবং পেনসিলভানিয়া এ ব্যাপারে সবদিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে বিধিনিষেধ তোলার দিনক্ষণ তারা দেননি।

লাইফ সাপোর্টে ব্রিটেনের স্বাস্থ্য সেবা

ব্রিটেনের এক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেছেন, দেশটিতে ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। সেখানে এক দিনেই প্রাণ গেছে ৮৮৮ জনের। এতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৪৬৪ জনে। বিবিসি জানিয়েছে, ব্রিটেনে চিকিত্সা সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে আক্রান্তদের চিকিত্সা দেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিত্সক ও নার্সদের পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা পোশাক (পিপিই) ছাড়াই এবং অন্যান্য চিকিত্সা সরঞ্জাম একাধিকবার ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ নিয়ে মার্কিন মিডিয়া সিএনএন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ব্রিটেনের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এনএইচএস একটি জাতীয় বিষয়। ব্রিটিশরা তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে খুবই সম্মান করেন। ২০১২ সালে অলিম্পিক গেমসের সময়ও এর প্রমান দেখা গেছে। ঐ সময় একটি দৃশ্য দেখানো হয় যে একজন নার্স হাসপাতালে শিশুদের শয্যার পাশে নাচছেন। কিন্তু করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় এর অব্যবস্থাপনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মনে হচ্ছে এনএইচএসও লাইফ সাপোর্টে চলে গেছে। এদিকে প্রধানমন্¿ী বরিস জনসন মন্¿ীদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কাজ শুরু করেছেন বলে জানা গেছে।

অন্যান্য দেশে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি

স্পেনে ২৪ ঘণ্টায় ৫৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশটিতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৪৩ জনে এবং করোনায় আক্রান্ত ১ লাখ ৯১ হাজার ৭২৬ জন। এদিকে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় জাপানের চিকিত্সা ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির চিকিত্সকরা। প্রাথমিকভাবে নিয়ন্¿ণে আনার দাবি করলেও জাপানে গতকাল আক্রান্ত প্রায় ১০ হাজার এবং মৃত্যু হয়েছে প্রায় ২০০ মানুষের। এরই মধ্যে দেশটিতে গতকাল ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। আফগান প্রেসিডেন্ট ভবনের অন্তত ২০ কর্মকর্তা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। পূর্ব জেরুজালেমে একজন আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

ভারতেও সোমবার থেকে লকডাউন শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। তথ্যপ্রযুক্তি মন্¿ী রবিশঙ্কর প্রসাদ টুইটে জানিয়েছেন, চিকিত্সা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে প্রায় সব ক্ষেত্র উন্মুক্ত, সব কৃষি ও উদ্যান পালনের কাজকর্মে কোনো বাধা থাকছে না। অর্থাত্ রবিশস্য কাটা এবং ঘরে তোলায় আর কোনো বাধা থাকছে না। সোমবার থেকে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের অফিসগুলোও খুলছে। তবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। সমুদ্রে বা নদী-পুকুরে মাছ ধরায় কোনো বাধা থাকছে না। মাছ চাষেও বিধিনিষেধ থাকছে না। এছাড়া আরো অনেক ক্ষেত্রে শিথিল করা হচ্ছে। দেশটিতে গতকাল পর্যন্ত আক্রান্ত ১৪ হাজার ৭৯২ এবং মৃত্যু হয়েছে ৪৮৮ জনের। পাকিস্তানে আক্রান্ত হয়েছে ৭ হাজার ৬৭৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৪৪ জনের।