মানুষ মরলেও লকডাউন তুলতে চান ট্রাম্প!

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২০, ২১:০০

শিফারুল শেখ

 

লকডাউন শব্দটি এখন অতি পরিচিত শব্দ। ইংরেজি হলেও অশিক্ষিত শ্রমিকও শব্দটি সম্পর্কে জানে। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে লকডাউন এবং কোয়ারেন্টাইন শব্দগুলো ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। প্রথম দিকে লকডাউন খুব জনপ্রিয় ছিল। কারণ এটা মানুষের মৃত্যু আটকাতে সহায়তা করছে। সুইডেন বাদে অনেক দেশই লকডাউনে। কিন্তু দিন যতোই যাচ্ছে ততোই লকডাউন তোলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে অনেক দেশ। এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দেশে হাজারে হাজারে মানুষ মরলেও লকডাউন তুলতে আগ্রহী তিনি। তার এই অবস্থানকে অনেক অঙ্গরাজ্যের প্রশাসন ‘পাগলামী’ বলে উল্লেখ করেছে।

বিপর্যস্ত বিশ্ব অর্থনীতি : যুক্তরাষ্ট্রে ইতিমধ্যে ২ কোটি মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা। ১৯৩২-৩৩ সালের মহামন্দার সময়েও এতো মানুষ কাজ হারাননি। মার্কিন প্রশাসনের ধারণা, এভাবে চললে অদূর ভবিষ্যতে অর্থনীতি আরো সংকটজনক হবে। সেজন্য গত বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেভাবেই হোক, জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করতে তিনটি ধাপের কথা বলেছেন। অর্থনৈতিক সংকটে চীনও। দেশের সরকারি সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২০ সালের প্রথম তিন মাসে চীনের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। ১৯৭০ সালের পরে এমনটি ঘটেনি। ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড বা আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে, ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি এশিয়া। গত ৬০ বছরে এই প্রথম এশিয়ার অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হবে না। ২০০৮ সালের মন্দায়ও এমন ঘটেনি। করোনার প্রকোপে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিই মন্দার মুখে। আইএমএফ জানায়, পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে এ বছর বিশ্ব অর্থনীতি ৩ শতাংশ ক্ষতির মুখে পড়বে। আইএমএফের পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৮ সালেও এশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ।

যেসব দেশে লকডাউন শিথিল : শনিবার পর্যন্ত ১৬টি দেশে লকডাউনের কড়াকড়ি শিথিল হয়েছে বা হচ্ছে। মৃত্যু বাড়লেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লকডাউন শিথিল করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে চান। যদিও বিশ্বে মৃত্যুর এক-চতুর্থাংশ এবং আক্রান্তের এক তৃতীয়াংশ তার দেশে। মিশিগান, নর্থ ক্যারোলিনা, ওহাইও, উটাহ, উইওমিং, নিউ ইয়র্ক, ভার্জিনিয়া ও মিনেসোটায় বিক্ষোভ চলছে। বিক্ষোভকারীরা লকডাউনকে ‘অসাংবিধানিক’ উল্লেখ করেছেন। বিক্ষোভকারীদের হাতে প্ল্যাকার্ডে লেখা— ‘কোভিড-১৯ একটি মিথ্যা বিষয়, বাস্তবতাকে ভয় করা যাবে না, প্রত্যেক ব্যবসাই গুরুত্বপূর্ণ, মানুষ কাজ চায়, সুইডেনের মতো হতে হবে, লকডাউনের সিদ্ধান্ত ভুল’ ইত্যাদি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চাইলেও ডেমোক্র্যাটপন্থি গভর্নররা লকডাউন তুলতে চান না। দেশটিতে করোনা ভাইরাস ও লকডাউন রাজনৈতিক রূপ পাচ্ছে। ভারতে আজ থেকে আন্তঃরাজ্য ও রাজ্যের ভিতরে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পরিবহন, লোডিং-আনলোডিংয়ে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য সরবরাহেও থাকছে না বাধা। সরকারি-বেসরকারি শিল্প ও শিল্প প্রতিষ্ঠান খুলতেও বাধা নেই। নির্মাণ শিল্প ও কৃষি খাতে শিথিল হয়েছে। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের অফিসগুলোও খুলছে। তবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

স্পেনে গত সপ্তাহে দেশটিতে উত্পাদন, অবকাঠামো খাত এবং অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় কিছু খুলে দেওয়া হয়েছে। ভাইরাসে আক্রান্তের ওপর লক্ষ্য রেখে বাকি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ইউরোপের প্রথম দেশ অস্ট্রিয়ায় খুচরা বিক্রেতাদের প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়েছে। ২ মে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আর মধ্য মে থেকে রেস্টুরেন্টও খুলে দেওয়া হচ্ছে। তবে সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। সুইজারল্যান্ডে ২৭ এপ্রিল থেকে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান ও হেয়ার ড্রেসার এবং পরিস্থিতি বুঝে ১১ মে থেকে স্কুল খুলবে। পানশালা এবং রেস্টুরেন্ট ৮ জুন পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। জার্মানিতে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রিত করতে চালু করা বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অনুমতি দিয়েছে এক আদালত। ‘উন্নত স্বাস্থ্য চাই, অধিকার হরণ নয়, ভাইরাস থেকে বাঁচাও, মানুষ থেকে নয়’ নামে প্রতিবাদ হচ্ছে। জার্মান সরকারও লকডাউন শিথিলের ঘোষণা দিয়েছে। ইতালিতে ২০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেলেও স্টেশনারি, শিশুদের পোশাক ও কিছু দোকান ১৪ এপ্রিল খুলেছে। এছাড়া ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, চেক রিপাবলিক, স্লোভেনিয়া, পোল্যান্ড, চীন, নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম ও ইরান শিথিল করেছে।

যেসব দেশে লকডাউন কড়াকড়ি : ১৯টি দেশে এখনো কড়াকড়ি আছে বা আরো করা হয়েছে। মৃত ও আক্রান্ত বাড়ায় ব্রিটেনে জুন পর্যন্ত লকডাউন নাও উঠতে পারে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক জানিয়েছেন। আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়তে থাকলে ফ্রান্সে ১১ মে পর্যন্ত লকডাউন বলবত্ থাকবে। সিঙ্গাপুরে ৪ মে পর্যন্ত লকডাউন থাকবে। দেশটিতে বিদেশি শ্রমিকদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়ছে। কানাডায় আরো কয়েক সপ্তাহ বিধিনিষেধ থাকবে। এছাড়া পর্তুগাল, হাঙ্গেরি, অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, সৌদি আরব, ইসরাইল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়ায় লকডাউন বলবত্ থাকবে। বিধিনিষেধ আরো জটিল করেছে জাপান, রাশিয়া ও সুদান।