দীর্ঘায়িত হইতেছে করোনা কাল। চিন্তার মেঘ জড়ো হইতেছে সাধারণের কপালে। কোনো কোনো মহলের নিকট হয়তো সংকট এখনো নস্যি। তবে অধিকাংশের দুশ্চিন্তা আগামী দিনগুলি লইয়া। কীভাবে কী হইবে! কৃষকের দুশ্চিন্তা ধানকাটার মৌসুমে লোকের অভাব। পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানচালক-হেলপারদের দুশ্চিন্তা কবে শেষ হইবে এই লকডাউন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য শহুরে লোকদের নিকট পৌঁছাইয়া দিতে তাহাদের ভূমিকাই বেশি। অপরদিকে, ভোক্তারাও অজানা আশঙ্কায় দিনাতিপাত করিতেছে। এমনিতেই ঘরবন্দি। তাহার উপর খাবারের মজুত গড়িয়া তুলিবার সুযোগও তাহাদের নাই। দিনমজুর কি আর কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা সঞ্চয় করিতে পারে? নিম্নমধ্যবিত্তেরও একই হাল। এমনও রহিয়াছেন যাহারা শ্রম দিয়া নিয়মিত মাইনে পান না। ইহার সহিত রহিয়াছে লাফাইয়া লাফাইয়া মূল্যবৃদ্ধি। কয়েক দিন পরেই রোজা। এখনই বাড়িয়া গিয়াছে পণ্যমূল্য। রোজা শুরু হইলে ‘পাগলা ঘোড়া’র মতোই ছুটিতে থাকিবে তাহা। প্রতিবারই তাহা হয়। এইবারে করোনার কারণে সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হইতেছে। ইহাকেই সুযোগ হিসাবে লইতেছে ব্যবসায়ীরা। ইহাদেরও বিভিন্ন স্তর থাকে। উত্পাদকের নিকট হইতে পাইকারি, খুচরা পর্যায়ে আসিলেই দাম কয়েক গুণ বাড়িয়া যায়। বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্তের মতোই লাফাইয়া লাফাইয়া বাড়ে দ্রব্যমূল্যের গতি। খুচরা বিক্রেতা বলে পাইকারের দোষ। পাইকার বলে সরবরাহ কম। ক্রয় করিতে হয় বেশি টাকায়। এই সকল অভিযোগ পুরাতন। কেহ কেহ বলেন, পণ্য আনা-নেওয়ায় যে হারে চাঁদা দিতে হয়। খুচরা দোকানিদেরও নানা ভাগে চাঁদা দিতে হয়। এই চাঁদার সংস্কৃতি বন্ধের কথা বলা ‘উলুবনে মুক্তো’ ছড়াইবার মতন কথা। এমন ‘দমবন্ধ’ পরিস্থিতির মধ্যে যাহাদের বসবাস, তাহাদের মানসিক স্বাস্থ্য লইয়াও চিন্তার উদ্রেক যথার্থই বটে।
বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ। এই দেশ হইতে মঙ্গা নিপাত গিয়াছে। না খাইয়া থাকিবার অবস্থা হইতে উত্তরণ ঘটিয়াছে। এমনই এক সময়ে দেখা দিয়াছে করোনার হানা। যাহা সরবরাহব্যবস্থার সকল শৃঙ্খলা ভাঙিয়া দিয়াছে। নানাভাবে উদ্যোগ চলিতেছে; কিন্তু পাইকারি বাজারও ইতোমধ্যে লকডাউন হইয়া গিয়াছে। ফলে, শঙ্কা করা অমূলক হইবে না যে—দেশের বিভিন্ন স্থান হইতে নিত্যপণ্য সরবরাহব্যবস্থায় ইতোমধ্যেই বিপর্যয় ঘটিয়া গিয়াছে। স্থানে স্থানে ‘ত্রাণ-যজ্ঞ’ (কেহ কেহ ত্রাণ চুরির মহোত্সব বলিতেছেন) চলিতেছে। তাহার মানে মানুষের কাছে পৌঁছাইয়াছে কি না—সেই প্রশ্ন নহে, এখন অবধি দেশে প্রচুর খাদ্য মজুত রহিয়াছে। ফসল তোলার মৌসুমও এখন। নতুন ধান আসিলে কৃষকের গোলা না ভরিলেও চালকলগুলিতে মজুত বাড়িবে। মজুত যদি যথেষ্ট থাকে, তাহা হইলে কেহই না খাইয়া মরিবে না—এই কথাটি হলফ করিয়া বলা যায়। তবে, শর্ত থাকিবে যে, কেহ মজুতদারি করিবে না, দেশের সর্বত্র সরবরাহব্যবস্থা অক্ষুণ্ন থাকিবে।
খাবার বলিতে শুধু ডালভাতই নহে, এখন বহু বিকল্প বাহির হইয়াছে। স্বাস্থ্যসচেতন অনেকেই এখন দুই বেলা ভাত ভোজন হইতে বিরত থাকেন। মানুষের জানাশোনার পরিধিও বাড়িয়াছে। শুধু ভাতই খাইতে হইবে—এমনটা অনেকেই আর মনে করেন না। সেই হিসাবেও দেশে খাবারের সংকট হইবার কথা নহে। শুধু গুরুত্ব দিতে হইবে যে—সরবরাহব্যবস্থায় কোনো গাফিলতি যেন না হয়। অতিদাম হাঁকাইয়া যেন ক্রেতার পকেট শূন্য করিবার ফন্দি কেহ করিতে না পারে। এমনিতেই মানুষের আয়-রোজগার বন্ধ করিয়া দিয়াছে করোনা। কাজেই মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ ঠিক রাখিতে পারিলে চিন্তার মেঘ কাটিয়া যাইবে, নিঃসন্দেহে।
