শেষ ট্রেন মিস করার পর

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২০, ২১:৪৯

তাপস কুমার দত্ত

একবার বৈশাখ মাসে ফরিদপুর থেকে ঢাকায় ফিরছিলাম। ছোটো লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে পদ্মার বুকে সূর্যাস্তের সময় নানা রঙে মেতে ওঠা আকাশ দেখে মনে হচ্ছিল মানবজীবন কতই না বর্ণিল! মনোরম! পদ্মার ঐ মাতাল হাওয়ার মতো। ঈশান কোণে কখন যে কালবৈশাখী জমে উঠেছিল, খেয়াল করিনি। হাওয়ার বেগ হুহু করে বাড়তে থাকে। দূরে দেখি একটি লঞ্চ খোলামকুচির মতো দুলছে। তাই দেখে আমাদের লঞ্চের কিছু টিনএজ ছেলে হিহি করে হাসছিল আর বলছিল—‘দেখ দেখ, কেমন দুলছে!’

পাঁচ-সাত মিনিট যেতে না যেতেই বড়ো বড়ো ঢেউ এসে আমাদের লঞ্চটাকেও কাগজের নৌকার মতো দুলাতে লাগল। সেই সঙ্গে ঝড়ো হাওয়া আর মুষলধারে বৃষ্টি। কোথায় যে মিলিয়ে গেল রঙিন আকাশ! বর্ণিল, মনোরম প্রকৃতি! সারা লঞ্চের মানুষ যেন ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আর্তচিত্কার জুড়ে দিল! ঢেউয়ের চূড়ায় উঠে যখন ধপাস করে নিচে নামছিল তখন মনে হচ্ছিল এই বুঝি সলিল সমাধি হলো!

কোভিড-১৯ আমাদের কিছুটা হলেও সময় দিয়েছিল। করোনার ঝড়টা যখন চীন থেকে বেরিয়ে ইরান এবং ইতালি, স্পেনসহ ইউরোপের বড়ো একটি অংশকে তছনছ করছিল, তখন ট্রাম্পের মতো আমরাও ভেবেছি ওটা আমাদের সমস্যা নয়। মার্স, সার্স, ইবোলা কম বিপজ্জনক ভাইরাস ছিল না; কিন্তু আমাদের এখানে আসেনি। করোনার সাগরে আমাদের ডুবতে হবে না। প্রথম দিকে ট্রাম্প পর্যন্ত দম্ভ করে বলেছেন—প্রতিবছর সাধারণ ভাইরাস ফ্লুতে আমেরিকায় এমনিতেই ২৫/৩০ হাজার মানুষ মারা যায়। গত ২০ জানুয়ারি ভাইরাসটি শনাক্ত হওয়ার দুই দিন পর ট্রাম্প বলেছেন—সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। এরপর দিন যায় আর ঈশান কোণে মেঘ জমতে থাকে। করোনা ভাইরাসকে যখন ৩১ জানুয়ারি বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়, তার এক দিন আগেও ট্রাম্প বলেছেন, আমাদের মাত্র পাঁচ জন আক্রান্ত হয়েছে, সবকিছুই খুব ভালোভাবে চলছে। এরপর ২৪ ফেব্রুয়ারিও তিনি আত্মবিশ্বাস অটল রেখে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে নোভেল করোনা ভাইরাস খুব ভালোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আছে। বাস্তবতা হলো—আমেরিকায় করোনা সংক্রমণ ততদিনে বিপজ্জনক চতুর্থ পর্যায়ে পা রেখেছে। ট্রাম্প অতপর সুর পালটে বলেছেন, আমেরিকায় মৃত্যুর সংখ্যা লাখের মধ্যে আটকে রাখতে পারলে সেটা হবে অনেক বড়ো ব্যাপার। এই মুহূর্তে আমেরিকায় করোনায় আক্রান্ত ৭ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি মানুষ। মারা গেছেন ৩৯ হাজার। এরপর ট্রাম্প সময়মতো সতর্ক না করার জন্য অভিযোগের আঙুল তুলেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দিকে। বন্ধ করেছেন ওদের জন্য বড়ো অঙ্কের নির্ধারিত অনুদান। এটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জন্যও অনেক বড়ো অভিঘাত। কারণ, সংস্থাটির মোট বাজেটের প্রায় ১৫ শতাংশ আসে আমেরিকার কাছ থেকে।

আমেরিকার আগে ইরান, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, ব্রিটেন যখন করোনার সুনামিতে ভেসে যাচ্ছিল, তখনো আমাদের দেশের কিছু মানুষ মনে করেছেন, করোনা দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করছে। এটা সৃষ্টিকর্তার সৈনিক! প্রকৃত বিশ্বাসীদের জন্য করোনা কোনো ভয়ের কারণ হবে না—এমন কথা বাংলাদেশের সিংহভাগ সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতেন। তার নতুন প্রমাণ মিলেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।

করোনা সংক্রমণে বাংলাদেশ এখন চতুর্থ পর্যায়ের প্রথম ধাপে। করোনাকে আটকানোর শেষ ট্রেন আমরা অনেক আগেই মিস করেছি। বিশ্বের ৩ শতাংশ জিডিপি ইতিমধ্যে খেয়ে ফেলেছে করোনা। আরো কতখানি খাবে, কতদিন এই দুর্যোগ চলবে—কেউ জানে না। হ্যাঁ, বিজ্ঞানীরাও জানেন না। কারণ, এটা এতোটাই নতুন ধরনের রহস্যময় ভাইরাস, যা পুরোপুরি বুঝতে বছর গড়িয়ে যাবে। সারা বিশ্ব কোমর বেঁধে ভ্যাকসিন তৈরিতে মাঠে নামলেও, আগামী সপ্তাহে টিকার ট্রায়াল হলেও, একটি কার্যকরী টিকা পেতে অপেক্ষা করতে হবে এক থেকে দেড় বছর। ২০২২ সাল পর্যন্ত করোনার করুণায় বাঁচতে হবে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত করোনা ছড়ি ঘোরাতে পারে। এসব কথা এই মুহূর্তের ভবিষ্যদ্বাণী। আর দুই দিন পর নতুন পরিস্থিতিতে অন্য ধরনের বয়ানও আসতে পারে গবেষকদের তরফ থেকে। সাধারণ মানুষের মধ্যে করোনা এখন নিয়ে এসেছে হাজার হাজার টোটকা দাওয়াই। তাবিজ-কবচ, গরুর চোনা-গোবর, ঝাড়ফুঁক, দোয়া-কালামের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। বয়ে যাচ্ছে চুরিচামারির বন্যা। ঘোলা পানিতে মাছ ধরতে নেমে পড়েছেন সুযোগসন্ধানীরা। আর চিকিত্সাবিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করে বলছেন, চুরির জিনিস কে খাবে? বরং অন্যদের থেকে তিন হাত দূরে থাকুন, নইলে তিন হাত মাটির ঘরে থাকতে হবে চিরকালের জন্য।  

অনেকে অবশ্য মনে করছেন, করোনাকে এত ভয় পাওয়ার কী আছে? করোনা ছড়িয়ে পড়ুক, মৃত্যুর হার তো মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশ। করোনায় যত বেশি মানুষ আক্রান্ত হবে তত তাড়াতাড়ি একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি (herd immunity) তৈরি হবে। অনেকে ট্রাম্পের মতো করে যুক্তি দেন যে, প্রতি বছর সারা বিশ্বে কেবল বায়ুদূষণে মৃত্যু ঘটে কয়েক কোটি মানুষের! তাই বলে কি দূষিত শহরে আমরা নিশ্বাস নিই না? পালিয়ে যাই? আর যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে বিশ্বে প্রতি বছর কয়েক কোটি মানুষ মারা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বছরে ৫৬ লাখ শিশু (প্রতিদিন ১৫ হাজার) মারা যায় কোনো না কোনো রোগে। এসবের যে কোনো একটি নিয়ে যদি প্রতিদিন ব্রেকিং নিউজ দেওয়া যেত তাহলে করোনার মতোই মাথার মধ্যে দুশ্চিন্তার আরো একটি নতুন কুঠুরি তৈরি হতো।

কিন্তু করোনার ভয় যে অন্যখানে! করোনার মতো এত মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ বিশ্বে এত ব্যাপকহারে কখনো ছড়ায়নি। যদিও এর মূলে এই আধুনিক সময়ের অত্যাধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা। এজন্য চীন থেকে ইউরোপে এবং ইউরোপ থেকে আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে করোনা ছড়াতে সময় নিয়েছে মাত্র কয়েকটি মাস। অতীতে বিশ্বে মহামারি তো কম হয়নি! ৩ হাজার বছর ধরে গুটিবসন্ত মানবসমাজকে চরম ভোগান্তিতে নাকানিচুবানি খাইয়েছে। রোগে আক্রান্ত ৩০ শতাংশ মানুষই মারা যেত। শুধু বিশ শতকেই এ রোগে মারা গেছে ৩০ কোটি মানুষ এবং সারা বিশ্বে এ রোগ নির্মূল অভিযান শুরু হওয়ার আগে প্রতি বছর ৫ লাখেরও বেশি মানুষ মারা যেত। প্লেগ তো নানা কারণে কুখ্যাত। চতুর্দশ শতকে ইউরোপের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা গিয়েছিল প্লেগে। প্লেগ আড়াই হাজার বছর ধরে বিশ্বকে জ্বালিয়েছে। শত বছর আগে স্প্যানিশ ফ্লুতে মারা গিয়েছিল বিশ্বের ৫ কোটি মানুষ। কলেরার কথা এখনো পুরোনো হয়নি।

কিন্তু করোনার ভয় অন্য জায়গায়। সেটা একটি ছোটো গল্প দিয়ে বোঝানো যায়। দাবা খেলায় মুগ্ধ হয়ে রাজা বিজেতাকে বলেছেন, কী চাও বল। বিজেতা বলেছেন, ‘দাবার মোট ৬৪টি ঘর আছে, প্রতিটি ঘরে আমাকে ধান দিতে হবে। তবে শর্ত আছে, প্রথম ঘরে একটি ধান, দ্বিতীয় ঘরে দুইটি, তৃতীয় ঘরে চারটি, চতুর্থ ঘরে আটটি, এভাবে দ্বিগুণ হারে ধান দিতে হবে।’ রাজা বললেন, তথাস্তু। খাদ্যমন্ত্রীকে আদেশ দিলেন। খাদ্যমন্ত্রী ধান দিতে গিয়ে ৬৪ ঘরের অনেক আগেই দম হারিয়ে ফেললেন। বললেন, রাজামশাই সারা পৃথিবীতে যত ধান আছে সব ধান এক জায়গায় করলেও ৬৪তম ঘর পূরণ করা সম্ভব হবে না।

করোনা ঠিক এভাবেই ছড়ায়। সুতরাং গৃহবন্দি থাকাটাই হলো একে কোণঠাসা করার একমাত্র উপায়। যদিও অনেকে মনে করেন, লকডাউন হলো করোনার দাবানল আটকানোর পজ বাটন মাত্র। লকডাউন একে আটকাতে পারবে না, গতি শ্লথ করবে মাত্র। তাহলে উপায়? ইতিমধ্যে করোনার প্রভাবে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। দেশে এখন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৮২ লাখের কাছাকাছি। এরা কী করে বাঁচবে? গত কয়েক দশক ধরে দারিদ্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যে সুফল মিলছিল, লকডাউনের ফলে তা প্রবল ঝুঁকির মুখে। বিশ্বব্যাপী এমন একটা মহামন্দা নেমে আসছে যেটা সম্পূর্ণ নতুন ধরনের মন্দা, যেখানে চাহিদা থাকলেও জোগান থাকবে না।

মনে হচ্ছে, করোনা ভাইরাস হয় হাতে মারবে, নয়তো ভাতে মারবে। বেশি দিন না। দুই কি তিন মাসের মধ্যেই আমরা জানতে পারব ঠিক কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি; কিন্তু করোনা-পরবর্তী বিশ্বে আমরা কি শুধরাব? আগুন লেগে পুরো বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে বাড়ির মালিকের চোখের সামনে। সেদিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে মালিক বলছে, এর পরও যদি ঘরে আরশোলা থাকে, তো আমার আর কিছুই বলার নেই!

n লেখক : সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার

[email protected]