সিলেট বিভাগীয় শহরের ১২০ শয্যাবিশিষ্ট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিত্সার জন্য ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করা হলেও এখানকার চিকিত্সা সুবিধা ও চিকিত্সার মান নিয়ে জনমনে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে করোনা চিকিত্সার জন্য বিদ্যমান সরঞ্জামাদি নিয়েও। এখানে নিয়োজিত এক জন ডাক্তার গণমাধ্যমকে বলেছেন, শামসুদ্দিন হাসপাতালে যে পিপিই (পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপম্যান্ট) আছে তা অনেকটা রেইনকোটের সমপর্যায়ের। বিশেষ করে করোনা আক্রান্ত হয়ে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. মঈন উদ্দিনের মৃত্যুর পর শামসুদ্দিন হাসপাতালের চিকিত্সা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। অনেকে বলছেন, এটা আইসোলেশন সেন্টার নামেই। এখানে কোনো চিকিত্সা নেই। যা হচ্ছে লোক দেখানো।
জানা গেছে, সিলেটে করোনা আইসোলেশন হাসপাতালটিতে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অক্সিজেনের সিলিন্ডার দিয়েই কাজ চলছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় থেকে আরো ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ চালুর চাহিদা চেয়ে ঢাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দিলে ৯ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ৯টি ভেন্টিলেটর ও ২০টি আইসিইউ বেডও সরবরাহ করে। কিন্তু সেই ভেন্টিলেটরগুলোও প্রস্তুত হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার এগুলো প্রস্তুত হওয়ার কথা ছিল। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, কাজে জড়িত প্রকৌশলীর সহকারী ঢাকা থেকে এসেছেন বলে তাকে বাসায় লকডাউন করে রাখা হয়েছে। বর্তমানে একসঙ্গে বড়ো বড়ো তিনটি সিলিন্ডার দিয়ে অক্সিজেনের কাজ চলে।
সিলেটে করোনা আক্রান্তদের চিকিত্সার জন্য শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে আইসোলেশন সেন্টার খোলা হয় গত ৪ মার্চ। প্রথম থেকেই শামসুদ্দিনে করোনা চিকিত্সা নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়। ৫ এপ্রিল ডা. মঈন উদ্দিনের করোনা পজিটিভ ধরা পড়লে ৭ এপ্রিল রাতে তাকে শামসুদ্দিন করোনা সেন্টারের আইসোলেশনে নেওয়া হয়। অবস্থার উন্নতি না হলে পর দিন তাকে বেসরকারি একটি আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়া হয় ঢাকা কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। চিকিত্সাধীন অবস্থায় ১৫ এপ্রিল তিনি মারা যান। ডা. মঈনের মৃত্যুর পর শামসুদ্দিন হাসপাতালে চিকিত্সার সক্ষমতার ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় উঠে। বলা হচ্ছে এখানে চিকিত্সা হচ্ছিল না বলেই তিনি ঢাকা যেতে বাধ্য হন।
জানা গেছে, শামসুদ্দিনের দুটি আইসিইউ বেডে সন্দেহজনক রোগীদের রাখা হয়। তবে তা যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না—এমন অভিযোগ রয়েছে। আইসিইউর জন্য সার্বক্ষণিক লোকবল নেই। সেন্ট্রাল অক্সিজেন, সেন্ট্রাল এয়ারকুলারসহ বেশ কিছু সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। সিলেটের অনেকেই এখানে পূর্ণাঙ্গ ভেন্টিলেশন সুবিধা বৃদ্ধিসহ আইসিইউ ইউনিট খোলার দাবি জানিয়েছেন।
ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. তানভীর মোহিতও সিলেটে করোনা মোকাবিলায় অব্যবস্থাপনা, সংকট ও ডা. মঈন উদ্দিনের চিকিত্সা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, যেদিন ডা. মঈনের পজিটিভ ধরা পড়ে, তাকে তার বাসায় রেখে আইসোলোটেড করে অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া হয়। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে শামসুদ্দিনে নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করি আইসিইউর জন্য। কিন্তু যে অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয় তাতে অক্সিজেনের ব্যবস্থা ছিল না। হাসপাতালে যাওয়ার পরও ২০ মিনিট অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা যায়নি। সেখানে সেন্ট্রাল অক্সিজেন নেই।
এ প্রসঙ্গে শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. সুশান্ত কুমার মহাপাত্র বলেন, ডা. মঈন উদ্দিনের শারীরিক অবস্থা আইসিইউতে রাখার মতো খারাপ ছিল না। অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়ার পর তার অবস্থা স্বাভাবিকই ছিল।
সরকারকে আইনি নোটিশ
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কিংবা শহীদ শামসুদ্দিন হাসপতাল বা অন্য স্থানে অন্তত ২০টি আইসিইউ বেড সংবলিত একটি সুরক্ষিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুল কাইয়ুম লিটন। বৃহস্পতিবার সকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে তার সরকারি ইমেইলে এ নোটিশ পাঠানো হয়।
