নিউ ইয়র্কে করোনায় অকালে ঝরে গেল বাংলাদেশি পিতার স্বপ্ন

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২০, ০০:২১

কোভিড-১৯ মহামারিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক। সেখানে ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত এবং ১৩ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। যাদের প্রাণ গেছে, তাদের মধ্যে অর্ধশতাধিক বাংলাদেশিও রয়েছেন। তাদেরই একজনের জীবনের গল্প শুনিয়েছেন সিএনএনের কলামিস্ট জন অ্যাভলন। তিনি লিখেছেন, এখন নিউ ইয়র্কে এক দিনে যত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, তা সংখ্যায় গত এক বছরের সব হত্যাকাণ্ডের চেয়ে বেশি। নাইন-ইলেভেনের হামলায় নিহতদের চার গুণের বেশি মানুষ ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাসে মারা গেছে। অনেক গল্প তারা পেছনে ফেলে গেছেন, যা বলা দরকার।

এরকমই একটি গল্প রয়েছে বাংলাদেশি মোহাম্মদ জাফরের। ৫৬ বছর বয়সি এই অভিবাসী পিতা ট্যাক্সি চালিয়ে নিজের সন্তানদের যুক্তরাষ্ট্রের সেরা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আমেরিকান স্বপ্ন পূরণে সম্ভাব্য সবকিছু তিনি করেছেন। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ১ এপ্রিল মারা যান জাফর। নিউইয়র্কের ব্রংকসের গান হিল সড়কের কাছে একটি অ্যাপার্টমেন্টে তিন সন্তানকে রেখে গেছেন তিনি।

জাফরের প্রতিদিনের কাজ শুরু হতো মেয়ে সাবিহাকে ম্যানহাটনের ট্রিনিটি স্কুলে নামিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। নামকরা ঐ স্কুলের সেকেন্ড গ্রেডের ছাত্রী সে। সারা দিন ভাড়া টেনে আবার স্কুল ছুটির পর মেয়েকে নিয়ে বাসায় ফিরতেন জাফর। তার এই পরিশ্রমের সুফলও আসছিল। বড়ো ছেলে মাহতাব শিহাব হার্ভার্ডে পড়েছে। বড়ো মেয়ে সাবিহাও সেই পথেই যাচ্ছিল। করোনা ভাইরাসের মহামারিতে হারিয়ে ফেলা বাবার সংগ্রামের গল্প মাহতাব শুনিয়েছেন জন অ্যাভলনকে।

মাহতাব বলেন, ‘বাবা সারাজীবন কাজ করে গেছেন, আমাদের অনেক দিয়ে গেছেন। ওনার খুব ভালো কোনো চাকরি বা কাজ ছিল না। কখনো ম্যাকডোনাল্ডসে কাজ করেছেন, খাবার ডেলিভারি দিতেন। উনি ক্যাব চালিয়েছেন। কিন্তু সব সময় চাইতেন পরিবারের, এখানে আমরা যারা আছি এবং বাংলাদেশে যারা আছে, কারো যেন অভাব না থাকে। সেই চাওয়া পূরণ করতে গিয়ে তিনি নিজের কথা ভাবেননি।’

বাবাকে স্মরণ করে মাহতাব বলেন, ‘তিনি চাইতেন আমরা যেন আমেরিকায় থাকার সুবিধাগুলো বুঝতে পারি এবং সেজন্য কতটা কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত তা যেন মাথায় রাখি। তিনি চাইতেন এখানে যত সুযোগ-সুবিধা আছে তা যেন আমরা কাজে লাগাই। তার অংশ হিসেবেই তার চাওয়া ছিল আমাদের লেখাপড়াটা যেন ভালো হয়।’

করোনা ভাইরাসের বিস্তার বাড়তে থাকায় মার্চে হার্ভার্ড বন্ধ হয়ে গেলে বাসায় ফেরেন মাহতাব। ততক্ষণে তার বাবা সেলফ কোয়ারেন্টাইনে। ট্যাক্সিচালকের চাকরিটা ঠিক রাখতে একবারই তিনি বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন। কয়েক দিন ধরে হালকা জ্বরের পর জাফরের তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ছেলেমেয়েরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। এক সপ্তাহ সেখানে ভেন্টিলেশনে রাখা হয় জাফরকে। সেখানে তার মৃত্যু হলো। পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশে জীবন বদলের সংগ্রামে লিপ্ত এক বাংলাদেশি অভিবাসীর জীবন থেমে গেলে ৫৬ বছর বয়সে।