চয়ন

টুকরো স্মৃতি

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:২৯

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠান পর হিজ মাস্টার্স ভয়েস গ্রামোফোন কোম্পানি যন্ত্রপাতি নিয়ে এল নারায়ণগঞ্জ ইউরোপিয়ান ক্লাবে। ঢাকায় রিহার্সেলের ভার দিল আমার ওপর। কোচবিহার থেকে ভাওয়াইয়া গানের জন্য কয়েকজন শিল্পীকে আনা হলো। আমার সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা ভাওয়াইয়া গানের কবি আবদুল করিম তখন কোচবিহারে, তাকেও আনালাম। ভাওয়াইয়া গান ছাড়াও একখানা ভাওয়াইয়া পালাগান ঠিক করলাম, তাতে আমার ছেলেমেয়ে, ভাই, স্ত্রী, আমি এবং বেদারউদ্দীন আহমদ এই কজনেই অভিনয় করেছি। পালাগানটির নাম ‘মহুয়া সুন্দরী’।

হবিবুল্লাহ বাহার তখন মন্ত্রী। কলকাতার গ্রামোফোন কোম্পানির হেমচন্দ্র সোম মশায় আমাকে বলে গেলেন বাহার সাহেবের একটা বক্তৃতা রেকর্ড করানোর জন্য। বাহার সাহেবকে বললাম। সাহিত্যিক মানুষ, রাজি হয়ে গেলেন। সময় দিলেন, পাঁচ দিনের মধ্যেই তিনি তাঁর বক্তৃতাটা লিখে ফেলবেন। রোজই গিয়ে তাঁকে মনে করিয়ে দিই, কিন্তু তাঁর সময় কোথায়? দশ-বারো দিন পর তিনি বললেন,‘হ্যাঁ, কাল রেকর্ড করার জন্য নারায়ণগঞ্জ যাব।’ আমি বললাম, ‘তাহলে মেহেরবানি করে বক্তৃতাটা একটু পড়ুন। এই যে স্টপ ওয়াচ নিয়ে এসেছি, সময়টা ঠিক করে নিই, কারণ সাড়ে তিন মিনিটের মধ্যে বক্তৃতা শেষ করতে হবে তো।’ তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, কাল স্টুডিওতে গিয়েই ঠিক করে নেব।’

তার পরদিন সাত-আটজন শিল্পীর রেকর্ড করার দিন এবং বাহার সাহেবেরও। অন্যান্য আর্টিস্টকে বললাম, ‘আপনারা একটু অপেক্ষা করুন, বাহার সাহেবের রেকর্ডখানাই আগে করে নিই।’ বাহার সাহেবকে বললাম ‘এবার পড়ুন, আমি ঘড়ি ধরে টাইমটা—’! তিনি হেসে বললেন, ‘আরে দূর বক্তৃতা কি আর লিখেছি, এই আরম্ভ করলাম লিখতে—’ বলেই তিনি কাগজ-কলম বের করলেন।

আমি হাসব কি কাঁদব—কী-ই বা আর বলতে পারি? তিনি বললেন, ‘আপনি অন্য শিল্পীদের গান রেকর্ড করতে থাকুন, এই ধরুন ঘণ্টা দুয়েকের ভেতরেই আমার লেখা হয়ে যাবে আর কি!’

সময় তো নষ্ট করা চলে না। শিল্পীদের মাইকের সামনে বসিয়ে দিয়ে যন্ত্র-বাজিয়েদের পজিশনমতো বসানো হলো। ফাইনাল রেকর্ডিংয়ের আগে দু-একবার রিহার্সেল দিতে হয়। যেই বিহার্সেলের যন্ত্রপাতি বেজে উঠেছে, বাহার সাহেব অন্য ঘর থেকে ছুটে এসে আমাকে বললেন, ‘এই একটু খানিক, ধরুন মিনিট বিশেক একটু চুপ করলে হয় না, এমন গান-বাজনার শব্দ এলে তো লেখাটা—’। কী আর করি, বন্ধ রাখলাম। মনে পড়ল কাজীদার কথা। কলকাতা রিহার্সেল রুমে সুর আর অসুরের দাপাদাপি, তার ভেতরে নির্বিকার চিত্তে লিখে চলেছেন কাজীদা। একদিন ধীরেন দাস কাকে যেন গান শেখাচ্ছিলেন, কাজীদাও সে ঘরে বসে বেশ খানিকক্ষণ গান শুনেছেন, তারপর তিনি কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে বসলেন। আমি আস্তে বললাম, ‘ধীরেন দা, আহ্, থামুন না, দেখছেন না কাজীদা গান লিখছেন।’ কাজীদা শুনতে পেয়েছেন। বলে উঠলেন, ‘আরে না না—গান চলুক। স্রষ্টা কি হট্টগোলেও তার সৃষ্টির কাজে এক মিনিটও বসে থাকে? তোমরা কাড়া-নাকাড়া বাজালেও আমি যখন ডুব দেব, তখন এগুলোর শব্দ আমার কানের কাছে এসে ওরাই বধির হয়ে যাবে।’           (অংশ)

আব্বাসউদ্দীন আহ্মদের ‘দিনলিপি ও আমার শিল্পীজীবনের কথা’ বই থেকে