করোনা মোকাবিলায় মুখোমুখি অবস্থানে বিশ্বশক্তি

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২০, ২১:২৬

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

বিশ্ব বর্তমানে নিউ লিবারেল পলিসিতে চলছে। সে মতে বিশ্ব চলমান কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় বিশ্ব শক্তিগুলোতে এক সঙ্গে কাজ করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বরং এই মহামারি মোকাবিলায় বিশ্ব শক্তিগুলোর দ্বান্দ্বিক অবস্থান ক্রমশ বাড়ছে।

চীনে যখন প্রথম করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হয় তখন পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমেরিকা পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল। পরবর্তীকালে নিজ  দেশের সংকটেও চীনের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়কে গুরুত্ব দিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু পরিস্থিতি দিনে দিনে ভিন্ন মোড় নিচ্ছে। বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট করোনা ভাইরাস চীনা সৃষ্ট তা প্রমাণে মরিয়া। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতি ‘চীনা প্রীতির’ অভিযোগ তুলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডোনেশন বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

দুই বিশ্ব শক্তির এমন দ্বান্দ্বিক অবস্থানের পাশাপাশি অন্য দেশগুলোর মধ্যেও বাড়ছে বিভাজন। চীন হচ্ছে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড়ো বাণিজ্যিক অংশীদার। অনেক দিনের বিশ্বস্ত বন্ধত্ব তাদের। কিন্তু মহামারি নিয়ন্ত্রণে চীনের ব্যর্থতা নিয়ে চীন ও ব্রাজিলের মধ্যে পক্ষে-বিপক্ষে বেশ বাগিবতণ্ডা হয়। দুই পক্ষের কূটনীতিকদের বাগিবতণ্ডা এতটা তীব্র আকার ধারণ করে যে চীন থেকে মেডিক্যাল সরঞ্জাম ক্রয়ে ব্রাজিলের স্বাস্থ্য বিভাগকে বেশ সমস্যায় পড়তে হয়।

আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে হয় ইউরোপকে। অভিন্ন স্বাস্থ্য বীমা, সীমান্ত তুলে দেওয়া, অভিন্ন মুদ্রা চালুসহ নানা সামষ্টিক উদ্যোগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন হয়ে উঠছিল শতাব্দীর শক্তিশালী আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংগঠনে। কিন্তু ইতালিতে যখন প্রথম সংক্রমণ শুরু হয় তখন জার্মানি ও ফ্রান্সের কাছে মেডিক্যাল সরঞ্জাম চেয়ে পায়নি ইতালি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফ্রান্ড গঠন করতে চাইলেও সেখানে ভেটো দিয়েছে জার্মানি, নেদারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলো। অন্যদিকে ফান্ড গঠনের পক্ষে ছিল ফ্রান্স, স্পেনসহ বেশ কয়েকটি দেশ। ইতালির যখন ক্লান্ত পরিস্থিতি তখন ইতালিতে মেডিক্যাল সরঞ্জাম, টেস্টিং কিট ও চিকিত্সক দল পাঠায় কমিউনিস্ট রাষ্ট্র কিউবা। এরপর এগিয়ে আসে ইউরোপের বন্ধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু চীন।

এমন কঠিন পরিস্থিতির দিনেও সম্পর্ক গলেনি অনেক রাষ্ট্রের মধ্যে। ২০১৫  সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন চার আরব রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন কাতারের। কোভিড-১৯ মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত দেশ কাতার। কাতারের অবস্থানরত মিশরীয় প্রবাসী ও শ্রমিকদের ফিরিয়ে নিতে মিশরকে অনুরোধ করলেও তাতে সাড়া দেয়নি সিসি সরকার। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলা ও কলম্বিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে কলম্বিয়ায় অভিবাসী প্রবেশ নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা চলছে। করোনা ভাইরাস হানা দিয়েছে কলম্বিয়ায়ও। কিন্তু সে দেশের একমাত্র কোভিড-১৯ শনাক্তকরণের একমাত্র কীট নষ্ট। ভেনিজুয়েলা সে পরিস্থিতিতে কলম্বিয়ায় দুইটা টেস্টিং কিট পাঠানোর প্রস্তাব করলেও সাড়া দেয়নি কলম্বিয়া।

কিউবা ও চীন যেভাবে বিপরীত কূটনৈতিক মেরুর দেশ হয়েও ইতালির পাশে দাঁড়িয়েছে। ভাবা হচ্ছিল বিশ্বে চলমান অন্যান্য দ্বান্দ্বিক কূটনৈতিক দেশগুলোর মধ্যে মেডিক্যাল সরঞ্জাম বিনিময়ের মাধ্যমে নতুন বন্ধুত্ব গড়ে উঠবে। কিন্তু সেটা হচ্ছে বেশ স্বল্প। বেশির ভাগ রাষ্ট্রই সংকটকালেও তাদের দ্বন্দ্ব ধরে রেখেছে। একটা বিষয় এখানে স্পষ্ট, প্রত্যেকটা দেশ নিজ উদ্যোগ ও বলয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে। সামষ্টিক কোনো উদ্যোগ  পরিলক্ষিত হয়নি। এসব ঘটনা প্রমাণ করছে মহামারির এই বিপদ রাষ্ট্রসমূহের জাতীয়তাবাদকে, সীমান্ত ভাবনাকে আরো শক্তিশালী করছে। 

করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক ভ্যাকসিন আবিষ্কার নিয়েও শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ট্রাম্প জার্মানির ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘কিওর ভ্যাককে’ কিনতে চাওয়া ভ্যাকসিনের আবিষ্কার নিয়ন্ত্রণেরই প্রচেষ্টা। জাপানের তৈরি কোভিড-১৯ প্রতিরোধক  ফ্যাভিপিরাভির ওষুধ চীন পরীক্ষামূলক ব্যবহার করলেও দক্ষিণ কোরিয়া তা গ্রহণ করেনি। তারা ব্যবহার করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি রেমডিসিভির। যে দেশ বা বলয় করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে কার্যকর প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পারবে বিশ্বরাজনীতি ও মেডিক্যাল ট্রেড তার নিয়ন্ত্রণে যাবে। এটা মাথায় রেখে ভ্যাকসিনের আবিষ্কার নিয়ন্ত্রণে বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে নতুন স্নুায়ুযুদ্ধ আসন্ন।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়