নিরাপদে হাওরের বোরো সংগ্রহ

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২০, ২১:২৮

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

বর্তমানে বাংলাদেশে সারা বছরে যে পরিমাণ ধান উত্পাদিত হয় তার একটি বিরাট অংশ অর্থাত্ প্রায় অর্ধেক আসে বোরো মৌসুম থেকে। সেই বোরো মৌসুমের মোট উত্পাদিত ধানের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ উত্পাদিত হয় হাওরাঞ্চল থেকে। অর্থাত্ পরিসংখ্যানটি নিম্নরূপ। সারা বছর সারাদেশে মোট ধান উত্পাদিত হয় ৩ কোটি ৮০ লাখ টন। তারমধ্যে শুধু বোরো মৌসুমেই উত্পাদিত হয় ১ কোটি ৯০ লাখ থেকে প্রায় ২ কোটি টন। আর কেবল হাওরাঞ্চলেই উত্পাদিত হয় প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টন। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় সাতটি জেলার ৪৭টি উপজেলায় এ বোরো ধানের আবাদ হয়ে থাকে। কাজেই এ অঞ্চলটিকে বোরো ধানের জন্য শস্যভান্ডার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। সেজন্য দেশের মোট বোরো ফসলের এক-পঞ্চমাংশ ফসল নিরাপদে ঘরে উত্তোলন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হাওরাঞ্চলের বোরো ধান নিরাপদে ওঠানোর জন্য একটি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়ে থাকে সেখানকার প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টিকে মাথায় রেখে। আমরা জানি প্রতি বছর অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দিয়ে এসব বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি করে থাকে প্রকৃতি।

এ বছর (২০২০) পূর্বের আশঙ্কার সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে করোনা ভাইরাসের মহামারি। কোভিড-১৯-এর কারণে বিশ্ব এখন কার্যত বিচ্ছিন্ন। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ তো নয়ই, আন্তর্জাতিক সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। অপরদিকে বিশ্বের সব দেশ এখন ফসল উত্পাদন কার্যক্রম চালাতে পারছে না। কোনো একটি দেশে অতিরিক্ত খাদ্য মজুত থাকলেও তা বিশ্বের অন্য যেসব দেশে খাদ্যপণ্য মজুত নেই সেগুলো যোগাযোগের অভাবে অন্যত্র পৌঁছানো যাচ্ছে না। সে কারণে সেসব এলাকায় দেখা দিচ্ছে খাদ্যাভাব। এমন পরিস্থিতি সামনের দিনগুলোতে আরো কঠিন থেকে কঠিনতর অবস্থা হবে। সেজন্য কোনো অবস্থাতেই আমাদের ইতিমধ্যে বোরো মৌসুমে ধানের যে বাম্পার ফলন, সেগুলো নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। তাই হাওরের বোরো ধানের প্রতি সবারই একটি নজর রয়েছে।

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সমতল ভূমির তুলনায় হাওরে একটু আগে এবং আগাম জাতের উচ্চ ফলনশীল বোরো ধানের জাত রোপণ করা হয়। সেজন্য সারাদেশের তুলনায় সেখানকার বোরো ধান একটু আগেভাগেই কর্তন ও মাড়াই করা যায়। তাই প্রতি বছরের ন্যায় এবারেও সেখানকার ধান কাটার জন্য এখন উপযুক্ত মৌসুম চলছে। কোনো কোনো জমির ধান এখনই কাটার উপযুক্ত, আবার কোনো কোনো জমির ধান আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে কর্তন উপযোগী হয়ে উঠবে। তাছাড়া আগাম পাহাড়ি ঢলের বন্যার আশঙ্কায় খেতের পুরো ধান পাকার আশায় বসে না থেকে ৮০ শতাংশ ধান পাকলেই তা কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দিয়ে থাকেন কৃষিসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ।

এ ব্যাপারে যেহেতু সরকার দায়িত্বশীল সেজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট সব মহল থেকে বিষয়টি দেখভাল করছেন। খোদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন যার ফলস্বরূপ তিনি বিভিন্ন জেলার সঙ্গে যখন ভিডিও কনফারেন্স করছেন তখন কৃষিপণ্য, সার, বীজ, কৃষিশ্রমিক, শাকসবজি, হাঁস-মুরগি, ডিম, দুধ ইত্যাদি জরুরি সার্ভিসের আওতায় বিবেচনা করে তাদেরকে করোনা ও লকডাউনের আওতার বাইরে রাখার পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। আর শুধু পরামর্শ দিয়েই ক্ষান্ত থাকছেন তাই নয়, তিনি সেটি যাতে পালিত হতে পারে তাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্ত্বাবধানে নেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।

আর যেসব কৃষকের নিজের টাকা দিয়ে মাড়াই যন্ত্র ক্রয়ের সামর্থ নেই তারা কমিউনিটিভিত্তিক সমিতি গঠন করে তা ক্রয়ের ব্যবস্থা করতে পারে। সেখানে স্বল্পসুদে কৃষিঋণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে সমতল ভূমির জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে বেশ কিছু প্রকল্প রয়েছে। ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রজেক্ট (এনএটিপি) ফেজ টু তাদের অন্যতম। তারা ১৫ থেকে ৩০ জন সমধর্মী সমআয়ের কৃষান-কৃষানির সমন্বয়ে সমিতি গঠন করে সেখানে তাদের কাছ থেকে সঞ্চয় নেওয়া হয়। তাদেরকে কৃষির বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যে বিভিন্ন কৃষির আধুনিক যন্ত্রপাতি বিতরণ করা হয়। সেই যন্ত্রের অর্ধেক টাকা সেই সমিতির কৃষান-কৃষানিগণ পরিশোধ করেন আর অর্ধেক অংশ প্রকল্প থেকে বহন করা হয়। এমন পদ্ধতি নিঃসন্দেহে হাওরাঞ্চলের জন্য প্রয়োগ করা যেতে পারে। আর করোনার এ সময়ে এমন জনবান্ধব যতরকম প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে ততই কৃষকের জন্য মঙ্গল হবে।   

n লেখক : কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়