কথায় আছে খাল কাটিয়া কুমির লইয়া আসা। খাল কাটিবার তো অনেক কারণই থাকে; কিন্তু উহার সহিত যখন ঝাঁকে ঝাঁকে হিংস্র কুমির চলিয়া আসে তখন তাহাকে আর যাহাই হউক বিধির লিখন বলা যায় না। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর ভৌত এবং জীবজগতে কত ধরনের ক্ষতি হইয়াছে এবং হইতেছে, তাহা লইয়া বিশ্বের বড়ো বড়ো গবেষণা জার্নালে প্রকাশিত হইয়াছে অসংখ্য প্রতিবেদন। সম্প্রতি নেচার পত্রিকা হইতে জানা গিয়াছে, মানুষ যে অসংখ্য জীবাণু ও তাহাদের বৈচিত্র্যকে এত দিন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করিয়াছে তাহারাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রক্রিয়ার সহিত নিবিড়ভাবে যুক্ত। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই কিছু আদিম জীবাণু শীতঘুম ত্যাগ করিয়া নূতনভাবে ফিরিয়া আসিতে পারে। এই জীবাণুগুলি যেমন সমুদ্রের অতল গভীরে থাকিতে পারে, তেমনই লক্ষ লক্ষ বত্সর ধরিয়া টিকিয়া থাকিতে পারে মেরু এলাকার বরফের মধ্যেও। কিছুদিন পূর্বে গবেষকরা ৩০-৪০ হাজার বত্সর আগেকার একটি জীবাশ্ম হইতে বেশ কিছু ভাইরাস আবিষ্কার করিয়াছিলেন। এই সকল ভাইরাসের ডিএনএ পরীক্ষা করিয়া দেখা গিয়াছে, ইহারা মানুষের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিপজ্জনক। আলাস্কার তুন্দ্রা অঞ্চলের কবরখানা হইতে পাওয়া গিয়াছে একটি ভাইরাসের আরএনএর ভগ্নাংশ, যাহা ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লু সৃষ্টিকারী ভাইরাসের সহিত সাদৃশ্যযুক্ত।
এখন যদি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফাবৃত অঞ্চলের বরফস্তর ক্রমান্বয়ে গলিতে শুরু করে তাহা হইলে অতীতে মহামারি সৃষ্টিকারী বহু ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার পুনরুত্থানের আশঙ্কা রহিয়াই যায়। এই আশঙ্কা এই কারণে অমূলক নহে যে, বাস্তবে এমন সংক্রমণের উদাহরণ রহিয়াছে। ২০১৬ সালে সাইবেরিয়ার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে ছড়াইয়া পড়ে অ্যানথ্রাক্স। পরবর্তী সময়ে দেখা গিয়েছিল ঐ অ্যানথ্রাক্স রোগের সূত্র হইল ৭৫ বত্সর আগের একটি হরিণের। হরিণটি অ্যানথ্রাক্সে মারা গিয়াছিল এবং উহার মৃতদেহটি বরফে কবর দেওয়া হইয়াছিল। অতঃপর ২০১৬ সালের গ্রীষ্মে ঐ অঞ্চলের বরফের স্তর গলিয়া যাইবার ফলে মৃতদেহটি অনাবৃত হইয়া পড়ে এবং জীবাণুরা মাটি এবং পানির ভিতর দিয়া খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে। এবং সংক্রমিত করে মানুষকে। প্রকৃতপক্ষে, মানুষ আর অণুজীবদের এই লড়াই আদিকালের। পরিচিত জীবাণুদের বাহিরে কিছু অপরিচিত জীবাণু, যাহারা অতীতে মানুষকে আক্রমণ করিত না, তেমন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াও মানুষকে আক্রমণ করিতে শুরু করিয়াছে। বিপদের কথা হইল, কুমেরু ও সুমেরু তাপমাত্রা প্রায় তিন গুণ বাড়িয়া গিয়াছে। কুমেরু অঞ্চলের অনেক হিমবাহের বয়স প্রায় কয়েক লক্ষ বত্সর। কয়েকটি হিমবাহ তো আবার বয়সে প্রায় ৮০ লক্ষ বত্সরের পুরাতন। বিজ্ঞানীরা দেখিয়াছেন, এই ধরনের হিমবাহের মধ্যে কোটি কোটি জীবাণু ঘুমন্ত অবস্থায় রহিয়াছে; কিন্তু এখন উষ্ণতা বৃদ্ধি ও বরফ গলনের ফলে তাহারা পুনরায় জাগিয়া উঠিতে পারে।
এক করোনা ভাইরাসের দাপটে সারা বিশ্ব কাঁপিতেছে। ইহার পর যদি নূতন নূতন বিপজ্জনক জীবাণু ভবিষ্যতে আঘাত হানে, তাহা হইলে মানবজাতিকে নূতন করিয়া সকল কিছু সাজাইতে হইবে। করোনা যেন ট্রায়াল মাত্র! তাহা যদি হয়, তবে এই সভ্যতা লইয়া মানবজাতিকে নূতন করিয়া ভাবিতেই হইবে।
