করোনার বিশ্বগ্রাস এবং আমাদের টুরিজম

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২০, ২১:৩৮

ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান

এখন করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ মহামারিতে সাড়া দুনিয়াই আক্রান্ত আর আতঙ্কিত। পৃথিবী জুড়ে প্রায় সাড়ে ২৪ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এই অসুখে। মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৬৮ হাজারের ওপরে। পৃথিবীর প্রায় ২১৫টি দেশ ও এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হুঁশিয়ারি দিয়েছে নিয়ন্ত্রণবিহীনভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে এই ভাইরাস। সমগ্র পৃথিবীর অর্থনীতি, উত্পাদন, ব্যবসায়-বাণিজ্য, পরিবহন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাসহ এমন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে করোনা ভাইরাসের কালো থাবা পড়েনি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ভলিউমের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আন্তর্জাতিক পর্যটনের ওপরও পড়েছে করোনার নেগেটিভ প্রভাব।

বিগত ১০টি বছর ধরে আন্তর্জাতিক পর্যটনের ক্রমান্বয় উন্নয়ন ঈর্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিগত ১০ বছরে প্রতি বছর গড়ে ৩-৪ শতাংশ হারে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই হিসাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা দাঁড়ানোর সম্ভাবনা আছে প্রায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন বা সাড়ে ৪০০ কোটির কাছাকাছি। কিন্তু করোনার জন্য সব হিসাবই কেমন যেন গরমিলের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। এই বছর অর্থাত্ ২০২০ সালে UNWTO বা রাষ্ট্রসংঘের টুরিজম অর্গানাইজেশনের হিসাবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গত বছরের তুলনায় ৩-৪ শতাংশ পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু হঠাত্ করোনার কালো থাবায় সব সেক্টরের মতো আন্তর্জাতিক পর্যটনও মুখ থুবড়ে পড়তে বসেছে। ভর পর্যটনের মৌসুমেই করোনার আবির্ভাব সব লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক এক নিউজ বুলেটিনে জাতিসংঘের পর্যটন অর্গানাইজেশন জানিয়েছে, এই বছর বিশ্বপর্যটকের সংখ্যা বিগত বছরের চেয়ে ৩০-৩৫ শতাংশ হারে কমে আসতে পারে। এবং সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক পর্যটন থেকে আয় কমে যেতে পারে ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। করোনা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে এই ক্ষতির সংখ্যা ও পরিমাণ। UNWTO ভাষ্য অনুযায়ী সবচেয়ে যে এলাকা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা হলো আমাদের এশিয়া প্যাসিফিক এলাকা। তাদের অনুমান অনুযায়ী এই বছর আমাদের এই রিজিয়নে অর্থাত্ এশিয়া প্যাসিফিক এলাকাতে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা ৯-১২ শতাংশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা হতে পারে, যা কিনা বিশ্ব রেকর্ড হতে পারে। যদি তা-ই ঘটে, তবে বিগত ১০ বছরের আন্তর্জাতিক পর্যটনের ক্ষেত্রে একনাগাড়ের উন্নতির লাগাম টেনে ধরতে পারে করোনা ভাইরাস। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বপর্যটনের ক্ষেত্রে করোনা যে প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে তা কাটিয়ে উঠতে কত বছর লাগবে তার হিসাবনিকাশ হবে করোনার তাণ্ডবলীলা শেষ হলেই।

ইতালি, ভারতসহ অনেক দেশই বিদেশিদের জন্য তাদের দুয়ার বন্ধ করে দিয়েছে। বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনস কোম্পানিগুলো যাত্রীসংকটের কারণে বিমান চলাচল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশে করোনা রোগীদের সুচিকিত্সা করার জন্য দেশে দেশে সাজ-সাজ রব পড়ে গেছে। এই সবকিছুর নেগেটিভ প্রভাব পড়েছে পর্যটনের ক্ষেত্রেও। সামগ্রিকভাবে সমগ্র ইউরোপ এখন অন্তরিন হয়ে আছে। অথচ এই ইউরোপেই বিশ্বপর্যটকদের অর্ধেকই ভ্রমণ করতে যায়।

বাংলাদেশের পর্যটনের ওপর করোনার প্রভাব কী হতে পারে? এখনো সরকারি মহল মনে হয় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরুই করেনি। আমাদের তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অর্থাত্ ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে মোট ২৮টি বিমান সংস্থা যাত্রী পরিবহন করে থাকে। এর মধ্যে দেশীয় বিমান সংস্থা রয়েছে চারটি। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আগে এই ২৮টি বিমান সংস্থার প্রতি সপ্তাহে বাংলাদেশ থেকে মোট ৬০৬টি ফ্লাইট ছেড়ে যেত। কিন্তু গত জানুয়ারি থেকে অর্থাত্ প্রায় আড়াই-তিন মাসের ব্যবধানে এই সংখ্যা বর্তমানে ৩৬৯-এ নেমে এসেছে। অর্থাত্, ২৮টি বিমান সংস্থা গত জানুয়ারি মাস থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত আড়াই মাসে ফ্লাইটের সংখ্যা ২৩৭টি কমিয়ে দিয়েছিল। আর বর্তমানে বাংলাদেশ সব বিমান যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন। সব ধরনের ফ্লাইট নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

 বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ধারণা, এ অবস্থা চলতে থাকলে জানুয়ারি থেকে শুধু মার্চ মাস পর্যন্ত বিমানে আর্থিক ক্ষতি হতে পারে ২৭০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ হোটেল সমিতির হিসাবে মার্চ মাসের শুরুতেই হোটেলগুলোর অগ্রিম বুকিং প্রায় ৪১ শতাংশ বাতিল করা হয়েছে। এখন সাড়া বিশ্বে যে অবস্থা তাতে এই বুকিং শতকরা ০ থেকে ৫ শতাংশে নেমে এলেও বিস্মিত হব না। কনভেনশন সেন্টার আর ব্যাংকোয়েট হলগুলো খালি পড়ে আছে। একটি ঐতিহ্যবাহী পাঁচতারা হোটেলে নাকি মাত্র ৯ জন বিদেশি আছেন যারা প্লেন যোগাযোগ বন্ধ হবার কারণে আটকা পড়ে আছেন। টুর অপারেটরদের অবস্থা শোচণীয়। একাধারে টুর ক্যানসেল হচ্ছে। ইনবাউন্ড আউটবাউন্ড তো বটেই, ডমেস্টিক টুরের জন্য এখন গ্রুপও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। সমস্ত কিছু কেমন যেন স্থবির হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের টুরিজম সেক্টর সম্ভবত এইবারই সবচেয়ে বেশি আঘাত পাবার দিকে এগিয়ে চলেছে। আমাদের দেশে ১৯৭২ সালে সম্ভবত অর্ধ লক্ষাধিক পর্যটক এসেছিলেন। ২০১৯-২০২০ সালে এই সংখ্যা হয়তো কয়েক হাজারে নেমে আসতে পারে অর্থাত্ বাংলাদেশের পর্যটন ইতিহাসে নিম্নমুখী পর্যটক আগমনের রেকর্ড সৃষ্টিকারী বছর হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো এক্ষেত্রে আমাদের কী করা উচিত? সেদিন দেখলাম টুর কোম্পানিগুলো এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেছে সরকারের কাছে। এগুলোর বেশির ভাগই হাস্যকর এবং অবাস্তব। যেমন তারা সরকারের কাছে তিন মাসের অফিস ভাড়া দাবি করেছে। করোনা পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে টুর কোম্পানিগুলোর কাছে প্রফেশনালি যে প্রস্তাব আশা করা গিয়েছিল তার ধারেকাছেও তারা যায়নি। অন্য সংগঠনগুলোও হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মনে হচ্ছে করার কিছুই নাই। তারা এখন বিমানের দুর্দশা নিয়ে হয়তো ব্যতিব্যস্ত। সেটাই স্বাভাবিক। বিমানের রিহ্যাবিলিটেশন এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ বিমান থেকে আয় তো সরাসরি মন্ত্রণালয়ের। পর্যটন থেকে আয় তো মন্ত্রণালয়ের পকেটে যায় না। সুতরাং সেই অর্থে পর্যটনের কোনো অভিভাবক নাই। আমরা এইজন্যই বারবার বলে আসি পর্যটনকে বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একীভূত করে মিনিস্ট্রি অব টুরিজম অ্যান্ড কালচারাল অ্যাফেয়ার্স করা হোক।

যা-ই হোক, পর্যটন মন্ত্রণালয় আপাতত এই সমস্যা কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যাবে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে—এই বিষয়গুলি নিয়ে চিন্তাভাবনার জন্য একটা টাস্কফোর্স গঠন করতে পারে। তাদের লোকজন, প্রাক্টিশনার, একাডেমিকস এবং রিসার্চার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার নিয়ে এই টাস্কফোর্স গঠন হতে পারে। তারা বসেই ঠিক করবে ক্ষতির পরিমাণ, পথ খুঁজবে আপাতত এই পরিস্থিতিতে ক্রাইসিস ম্যনেজমেন্ট কীভাবে হতে পারে এবং এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার জন্য ভবিষ্যতে কী পরিকল্পনা করা যেতে পারে। আর একটা বিষয় মনে রাখতে হবে। এখন ঝড় বইছে, এখন কোনো দুর্যোগ মোকাবিলার প্রয়োজন নাই। আমরা দুর্যোগের সঙ্গে লড়তে পারি না। সুতরাং দুর্যোগ আসার আগে এবং দুর্যোগ চলে যাবার পড়েই কী করতে পারা যায় সেই পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি। সুতরাং পর্যটনকেও ধৈর্য ধরে সতর্কতার সঙ্গে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

এবারে একটু ভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করি। ফেসবুকে একটা সংবাদ ভাইরাল হয়েছে। পর্যটক না থাকার কারণে নাকি কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে পানি একদম নীল হয়ে এসেছে এবং সেই সঙ্গে সমুদ্রতটের অতি কাছেই নাকি দলে দলে ডলফিন ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই সংবাদের সত্যতা কতটুকু জানি না, কারণ যে ছবিটা ভাইরাল হয়েছে তাতে সমুদ্রের অবস্থান দেখে আমার ব্যক্তিগতভাবে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। তবে মনে মনে ভাবি, সংবাদটা যেন সত্যিই হয়। এই সংবাদ সত্য হলে সবাইকে বোঝানো সম্ভব হবে সাস্টেইনেবল টুরিজম কাকে বলে। এটি সাস্টেইনেবল টুরিজমের এক সুন্দর কেইস স্টাডি হতে পারে। শুধু তা-ই নয়, এর ওপর ভিত্তি করে আমাদের পর্যটন স্থানগুলোর সাস্টেইনেবিলিটির ওপর পলিসি তৈরি করা যেতে পারে। যেমন—২/৩ বছর পরপর এই সমস্ত সংকটাপন্ন পর্যটন স্থানগুলোর রেশনিং করা যেতে পারে। অর্থাত্ এই সমস্ত সংকটাপন্ন স্থানগুলো ২/৩ বছর পরপর পর্যটকদের জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় বন্ধ রাখতে পারা যায়। এতে আমাদের সংকটাপন্ন পর্যটন স্থানগুলো নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে। সুতরাং করোনা যে আমাদের শুধু ধ্বংসই এনেছে তা নয়, পর্যটন প্রকৃতির জন্য করোনা আশির্বাদ বয়েও আনতে পারে। পরিশেষে বলব, পর্যটন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল শিল্প। সুতরাং পরিকল্পনা ও পলিসি প্রণয়নের ক্ষেত্রে পর্যটনকে চামড়াশিল্প, সিমেন্ট শিল্প, জাহাজ ভাঙগা শিল্প এমনকি পোশাকশিল্পের সঙ্গেও একই দৃষ্টিতে দেখা উচিত হবে না।

n লেখক : অধ্যাপক, ম্যারিটাইম টুরিজম ডিপার্টমেন্ট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ম্যারিটাইম ইউনিভার্সিটি